ব্রাত্য রাইসু

মে ১৫, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

২৯ জুলাই থেকে

যেমন গাছের পাতা

তুমি পাশ দিয়ে যাও

তারা চমকে ওঠেন।

 

আমি তোমার পাশে

বসতে চেয়েছিলাম

২৯ জুলাই থেকে–

তা কি গণ্য হবে?

 

নাকি চমকলাগা

পাতা পাতা পাতাই

আমার হতে হবে

ওগো বিলম্বিনী?

 

১৫/৫/২০১২

 

free counters

মে ৬, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

ভ্রূকুটি

যদি একবার সে তাকায়
ভস্ম হয়ে যাই
এ্রই দুপুর বেলায়
তার ঘরে ফ্যানের বাতাসে
যেন উড়ে যাবো
জানালার ফাঁকে
গাছে
কাকের বাসায়
আমি নাই
শুধু কিছু ছাই!

৮ এপ্রিল ২০১২

free counters

মে ৩, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

নদীমধ্যে গুরুসঙ্গ: আ জার্নি বোট ১৭

টক শো শুনতে ছিল
রেকর্ডেড
উন্নয়নকর্মী এক
চরপ্রান্তে ওই দিকে কাফিলা জঙ্গলখানি
যেথা থেমে গেছে…।

সে তো মাদুর বিছাইয়া
চক্ষুদ্বয় মুঁইদা টুঁইদা
অতিশয় মগ্ন হইয়া শুনতে ছিল
নূরুল কবীর
নাকি তানিয়া আমীর
না সৈয়দ আবুল মকসুদ
কিংবা আসিফ নজরুল
কিন্তু
অকস্মাৎ তাম্বুমুখে দেখা দিল
গুরুর কাহিনী
তারা মানিব্যাগ দেখাইয়া দিল প্রথমেই
বললো কত চাই?

উন্নয়ন মহিলা কর্মী
দেখিয়া দেশীয় দাতা
গুরুমুদ্রা সন্দর্শনে
বুইঝা ফেললো সকলি তো তৎক্ষণাৎ
বললো, ভাই, আপনাগের কত জন চাই?
কোথায় যাইতে হবে
কোন স্কুলে
ফাইভের না সিক্সের বাচ্চা
দেখতে টেখতে সুন্দর সুন্দর নাকি
নাক দিয়া সর্দি ঝরিতেছে?
আর কারা কারা আসবে,
নরওয়ে না ফ্রান্স থিকা?
পার বাচ্চা পাঁচশো টাকা দিতে হবে
উহাদের খাওয়ার খরচ সেও আপনাদের
আমি এত কিছু তো জানি না, তবে
ব্র্যাক কিংবা আশার লোকরা যাতে
না জানে যে তাদের কুমীরছানা
দিতাছি আপনাগো ধার
সে হইলে খবর আছে
এখন বলেন ভাই এবং বোনেরা
আপনাদের কোন ধরনের
কত বাচ্চা
আজিকা দরকার?”

“আরে বাচ্চা না বাচ্চা না আমরা
জার্নি বাই বোট থিকা নাইমা আইছি
এই ফালতুর চরে
গুরুর কারণে আমরা অকারণ হইয়া রইছি
এখন গুরুর
আনকোড়া নতুন কথা শুনতে পারে
এমন নবীন মেধা আইজকাই দরকার
তারে খুঁজতে আইছি এই চরে
যদি যায় পাওয়া
তারে ল্যইয়া ওয়া
নিয়া যাবো ধইরা বাইন্ধা
যার মনোযোগ
দেইখা সে আমগো গুরু নতুন ধরনে আর নতুন বরনে
কথা বলা ধরবেন কারণ তিনি আগিলা ফর্মে
খুব বোরড ও টায়ার্ড।”

উন্নয়নী উদ্ধারিনী হরিষিলা বিষাদিলা
“এই কথা এই কথা
তা তো আগে তো বলবেন
এ বড় নতুন কথা
প্রতিদিনিই শুনতে আছি
নতুন কিছুর তরে
সবুজ কাঁচার পরে
ধরনীর ভার
আর আমার
গোয়া মারা আমি তো খাবো না
এনজিওনী হইতে পারি
কিন্তু আমি বেশ্যা তো হবে না
ফাউল গুরুরে গিয়া কন গা গিয়া
নিজেরে কইতে কথা কানে কানে নিজেরে শুনিতে
হালার বলদ যত
চরাঞ্চল ভইরা ফেললো অ রে!”

২/৫/২০১২

free counters

মে ৩, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

নদীমধ্যে গুরুসঙ্গ: আ জার্নি বোট ১৬

“কিছুই যায় না বলা
যা বলি তা বইলা দেখি
আগেও তো এই কথা
বলছি বহুবার।”

“গুরু তা কি সমস্যার?
পুরানা কথাই যদি
নতুন ভঙ্গিতে বলা
সেও তো নতুন কথা
তার তোও মূল্য অনিবার।”

“কী কারণে অনিবার কইলা কও তো?
কী কারণে নতুন মানেই ভালো
কী কারণে পুরানা কথাই
নতুন ভঙ্গিতে বললে
হয়ে গেল নতুন কথাই?
যদি তুমি পুরানা কথাই–
যে কোনো ভঙ্গিতে বলবা
তার সব পুরানা কথাই
কথার কথায় ভঙ্গি
ভাইঙ্গা পড়ে, মিশশা যায়
হইয়া ওঠে ভঙ্গীসর্বস্ব বাক্য
সেই সেই পুরানা কথাই।
আমি এর থিকা এবে মুক্ত হইতে চাই।
পুরানা লোকজন থিকা নতুন কথার কথা
আরম্ভ হবে না।
কিছু যাত্রী ঢাইলা ফেলো নদীবক্ষে
নৌকা দেখলে নিষ্কাষণ করো
নামাও চরাঞ্চলে, ওঠাও নতুন লোক
খেয়াল রাখবা যেন তারা
এনজিও না-করা!

তো কী কারণে অনিবার বইলা দিলা
আমি তো দেখতে আছি এসবের তো
সবই চক্রাকার।
আগে যা বলছি মানে যখন বলতাম আগে
শ্রোতার আগ্রহে সেই বলাখানি
শক্ত পোক্ত নিরেট টিরেট থাকতো
এখন তো আগের কথাও আর আগের মতন কইরা…
বলতে গেলে মনে হয় শ্রেণিকক্ষ নদীবক্ষে
দুলিতেছে
অমনোযোগীরা সব মনোযোগে ঘুমাইয়া পড়তেছে
আমি কেন কী যে বলতে আছি
বোবা কইল বধিরেরে
‘এ সূর্যের নিচে তো ভাই
নূতন কিছুই নাই
তাই তাই
সবই চক্রাকার।’
আর দেখো
কেউ কিছু শুনতেই আছে না!
খালি কানে শোনে মুখে বলে ‘সবই চক্রাকার!’
মাত্র দিন দুইয়ের ভ্রমণ
অথচ তারাও দেখো
এ নৌকায়ও
তারা না শোনায় নিতান্ত নিতান্ত মগ্ন
যেন জাইগা জাইগা সকলে ঘুমায়
অথবা ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া জাগে…

তোমরা চর টর ঢুঁইড়া দেখো
আনকোড়া নতুন কান পাওয়া যায় কিনা?”

“গুরু কি শিক্ষিত লোকের খোঁজ হুগনা বালুচরে
করতে চান?
নাকি চান যেমন তেমন
কিছু একটা হইলে হবে
খালি আপনি যা দিবেন বাণী
সে শুধু নতুন শুনবে–আগে শোনে নাই?”

“আগে তা শুনবে কেন? আগে আমি বলছি নাকি, ‘আগে বলি নাই!’”

“তথাস্তু তথাস্তু গুরু আপনি যা বললেন
তা যে আগেও বলছেন তা তো
বলার উপায়খানি
আগের টাগের মতো
আজি আর নাই।
আমরা টাকা পয়সা লইয়া ঘুরি
দেখি হেথা চরের কোনায় কাঞ্চিতে কোনো
নবীন গভীর শ্রোতা ভাড়া পাই কিনা।”

২/৫/২০১২

free counters

এপ্রিল ১৭, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

শুনো মোর প্রেমেরো কাহিনী [গল্প: ১৯৯৪]

মিয়া চিঠি এত দেরি করলা! আমি তো খালি তোমার কথাই ভাবি। ভাবতে গিয়া দেখি খুব কিছু ভাবি না। ভাবি—তুমি। ভাবি—দেখা হইলে ভালো হয়।

কালকে মদ খাইলাম। তোমার দুঃখে। দুঃখটা এই রকম: আমি যা বোঝাইতে চাই তুমি খালি বেশি বেশি বোঝো। বানোয়াট কথা। এমনেই খাইলাম। তবে তোমার কথা তখন মনে হইল। মনে হইল তুমি যে কোন ক্লাসে পড়ো তা আমি জানি না।

তারপর ধরো তুমি এখন কেমন? তোমার নেপালী বন্ধুরা। আমি অবশ্য জানতে চাইতেছি না। এমনেই জিগ্যেশ করলাম। ওরা কি আগের চেয়ে বোকা হইছে? এমনিই জানতে চাইলাম। রাগ করলা না তো? তুমি রাগ করলে তো আমার আর কেউ থাকে কই?

কেরদানি করতেছি আসলে। লেখক না আমি! ক্ষমতার টের দেখতেছি। ভনিতা করতেছি। দেখি আবেগ হয় কিনা। হয় নাকি আপু? হইলেও তো আপনে বলবেন না। আপনে তো খালি আমারে দেখতে পারেন না। আমার সেই লাইগা কত দুঃখ। আমি তাই কানছি। আমার কান্না আর কে বুঝবে। আমি তো আর অত কাঁদতে পারি কই? আমি সেই-যে না কানছিলাম তখন কত চাইছি তুমি আইসা বলো কান্দে না বাবু কান্দে না বাবু নেও দুদ খাও…। আমি তো দুদ খাই আর সে বলে পাগল, পাগল, এত জোরে টানে না! শেষে দুধ ছিঁড়া গেলে আমি দুধ পামু কই? আর তুমিই বা তখন কী খাইবা, তখন তো না খাইতে পাইয়া মারা যাইবা!

আমার তখন আরো কত দুঃখ। আমি মারা গেলে শেষে কত দুঃখ হইব! সেই দুঃখে আবারও কান্দি কান্দি তখন সে বলে আমার সোনা, আমার নুংকু!

আমি বলি সেইটা তো আমার। তোমার তো নাই।

সে খুব তখন বলে সিমন দ্য বভোয়া!

আমি বলি তাই?

সে বলে জটিল হইছে এতক্ষণে খুব জটিল হইছে!

২.
তো বাবু, তোমারে চিঠি লিখতে গিয়া সাহিত্য করতেছি। এ ভাবেই লিখে যেতে ভালো। তুমি পড়তে গিয়া কীভাবে নেও এই লেখা? তোমার কাছেই যে লিখতেছি তা কি মনে হইতেছে, অপরিচিত লাগতেছে না তো আমারে?

সে তো সবসোমায়ই লাগে।

তুমি এইভাবে কইতে পারলা?

না, বলি নাই তো। আর অপরিচিত বইলাই তো তোমারে এত ভালোবাসি।

বাসো?

হেঁ, বাসি।

ঘোঁট পাকাইতেছ?

পাকাইতেছি, মম রইছউদ্দিন!

মম কেন?

আমি জানি না রাইসু, আমি জানি না!

৩.

বাবু দুপুর হইছে তো তাই ক্ষুধা লাগছে এখন খাইতে যাবো কালকে রাতে তো বাসায় ছিলাম না তাই এখন ক্ষুধা লাগছে তাই রাত্রে মদ খাইছি তো মনজুর ভাই মদ খাওয়াইছে তো খুব ভালো লাগতেছিল তখন তোমার কথাই কত ভাবতেছিলাম শেষে একটা কাগজের উল্টা পিঠে কী সব কী সব লিখলাম হয়ত ধরো লিখলাম আমি তোমার কাছে চিঠি লিখতে বসছি আর আমার তখন কত ভাল্লাগলো খালি মাথার দুই পাশে কান বন্ধ হয়ে আসছে চোখ বন্ধ করলে নিচের দিকে পড়ছি পড়ছি পড়ছি চোখ খুললে ঝাক্ করে হোঁচট, আবার লিখলাম ‘বাবু’, তাতেই কত ভাল্লাগলো মনে হইল বাবু খালি শরীরের কথা বলে কেন বয়স তো অপ্ল অত কেমনে বুঝবে যথা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক যথা সময় কাটানো যথা শিল্প যথা আমি যেভাবে তারে গ্রাহ্য করি…।

তুমি আমারে গ্রাহ্য করো? চুদলাম না তোমারে! তুমি কে? হু আর ইউ? স্টুপিড! খুব জানুয়া হইয়া গেছো তুমি?

জানুয়া হই নাই তো বাবু। জানুয়া হই নাই। আমি ভালোবাসতে জানি না তো তাই এই রকম বলছি। তুমি অন্যভাবে নিও না।

তুমি সবসময় খোঁচা দিয়া কথা বলো। আমার দাঁত আছে, সেই লাইগা আমি হাইসা উড়াইয়া দেই। আর তুমি ভাবো ও তো শসতা, ও তো আমার জন্য পাগল হইছে। থুঃ!

আমার তো ভালোবাসা নাই তাই এই রকম হয়।

নাই তো আমারে বলো কেন? সব কথাই তুমি আমারে বলো। আমি তোমার কে যে সব তুমি আমারেই বলবা!

না, আমি তো আরো লোকজনরে বলছি তো।

বলবাই তো। আমি তোমার চরিত্র জানি না! খালি ভালোবাসছি তাই…

সেই তো, আমার চরিত্র তুমি শুনবা? তোমার কাছেই বলি। তুমিই তো আমার একমাত্র বন্ধু। তখন কত আগে। অনেক আগে। আমার তখন বয়স চৌদ্দ হইছিল। তাই পাশের বাড়িতে গেছিলাম। তখন সন্ধ্যা হইছিল। তখন বারান্দায় সেই বাড়ির পিতা আর এক ভদ্রলোক কথা কয়। আমি ঘরের মধ্যে ঢুকছি। আমার বয়স অল্প ছিল যে তারা আমারে দেখতে পায় নাই। তারপর ঘরের মধ্যে গেলে আরেকটা ঘর ছিল। তখন ওইখানে দেখি দুইটা মেয়ে। ওরা রংপুর থাকে তো তাই বেড়াইতে আসছিল। ওরা সোজা সোজা হইয়া শুইয়া ছিল, ঘুমাইয়া ছিল। আমি তখন দুই জনের বুকের মধ্যে হাত দিছি। কিন্তু ওরা তো চোখ বন্ধ রাইখা মুখ খুললো। দেখি ওদের দাঁত লাল। ওরা ওইখানে বেড়াইতে আসছিল। রংপুর থাকে তো তাই বেড়াইতে আসছিল। ওদের চেহেরাও দেখি নাই ভালো কইরা। সত্যি! সত্যি!

তুমি ওদের দাঁতে হাত দেও নাই তো?

না, মাথা খারাপ! আমি তো ভয় পাইছিলাম তো।

এইসব তুমি আর করবা না। তোমার বুকে হাত দিতে ইচ্ছা করলে আমারে বলবা। দেখো না আমার কত বুক!

দেখি তো, দেখি… কিন্তু আমার যে অনেক খিদা লাগছে বাবু।

সে বলে, তোমার যে খিদা লাগছে আর কাউরে বলো নাই তো?

আমি বলি, না, বলি নাই।

সে বলে, আসো, আমার সঙ্গে আসো।

আমি যাই। আমরা ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামতে থাকি। সে আমারে ভাত খাওয়ায়। মুখে তুলে দেয়। বলে, বুঝছো? বুঝছো? তুমি যে বাচ্চা তাই এইভাবে তোমারে খাওয়াই। বুঝছো? রাগ করো নাই তো?

আমি বলি, না। তারপর ঘাড় কাত করি।

৪.

সে, আমার ঘাড়ে কামড় দেয়।

ঢাকা, ১৯৯৪

free counters

এপ্রিল ১, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

নদীমধ্যে গুরুসঙ্গ: আ জার্নি বাই বোট ১

পরিবৃত চামচা অবস্থায়
গুরুর দুইটি দিন নদীমধ্যে যায়

কী খান কী খান না গুরু ভাবিয়া তৎপর
লঘিষ্ঠ মহর্ষিবৃন্দ স্ফারিত-অন্তর

নদীমধ্যে হাঁটুজল তাহে ডিংগা জাহাজসমান
ভাসে না তো উড়ে চলে চলে নানহা আহার্যসন্ধান

কিছুই খান না গুরু নিতান্তই বায়ুভূক তিনি
কোনো কৌতূহল নেই শুধু
সঙ্গে দুই আচানক নারীবাদ নন্দিনী
জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সদাই নিয়ত ব্যস্ত, গুরুর আবেশে
গাছের সৌন্দর্য দ্যাখে মাছের সৌন্দর্য দ্যাখে
দেখে রাখে আলুর সুষমা—
নানা কথা জানতে গিয়ে জানা কথা জেনে ফ্যালে
শিখে ফ্যালে কেন তপ্ত হয়ে যায় বালু
তখন ছন্দের তরে (ছন্দ মানে অন্ত্যমিল) গলুইয়ে ছন্দুকবাজ
হাঁক মারে: ‘খালু!’
খালাসি লস্কর আর গুরুর চামুণ্ডেবর্গ একযোগে মাথা নাড়ে:
‘চালু! চালু!! চালু!!!’

ফলে নৌকা পানি পায় সাড়ে সাড়ে চৌতিরিশ হাজার
এবং পাঁচশো আর
ভবিতব্য খটখটে শান্তিপারাবার, এ ভবতরণীপারে
কে না জানে শ্যাষকালে নারীরা উদ্ধার। তাই
আমাদের নারীশক্তি, মাত্র দুই, আঁকা হয় বাঁকা হয়
বেঁকে যেতে যেতে সোজা হয়
মহাশূন্যে ধাক্কা মারে (নারীবাদী উষ্মাহেতু)
ততঃপর বজ্রকণ্ঠে ‘নারীমুক্তি’ কয়
প্রটোকল ভঙ্গ করে নাব্য গুরু চমকে ওঠে: ‘এগুলা কী হয়!’
দেখিয়া বিশ্বের লাগে বিষম বিস্ময়
জয় গুরু মেঘে-পাওয়া-রবিন-ঠাকুর কি বলো জয়!

।। ইতি যাত্রাপর্ব ।।

১৯৯৭

free counters

মার্চ ৩১, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
0 comments

মজিব কই রইলা রে

মজিব কই রইলা রে বাংগালি গো থুইয়া
বাংগালিরা মরতে আছে ছিডা গুললি খাইয়া
মজিব কই রইলা রে!

এইটা একটা গানের শুরু। মতলবের ছেঙ্গার চরে নানাবাড়িতে গিয়া শোনা এই গান। ১৯৭৪ সালে। বড় মামা আওয়ামী লীগের এমপিগিরি করতেন তখন। আগে শেখ মুজিবের লগে জেল খাটছেন কয়েকবার। নারায়ণগঞ্জে বিস্তৃত বাড়িতে বসবাস করতেন। আম্মার লগে মনে হয় দুই বার গেছিলাম ওই বাড়িতে। ‘৭৫-এর আগে। চাকর বাকর আর সরকারে ঠাসা বাসা। দেখতাম মামার ছোট পোলায় মুখ আর হাতভরা খাবার খাইতে খাইতে রুমের পর রুম থপ থপাইয়া দৌড়ায়। পিছনে চাকরের দল। আমরা গরীব মানুষের নিরব ছেলের মতো শান্ত যাইতাম ওই বাসায়।

আমার শার্ট আর হাফপ্যান্ট আম্মা হাতে চলা সিঙ্গার সিলাই মেশিনে তৈরি করতেন। আরো পরে, ক্লাশ সেভেনে পড়ার সময়ে, ১৯৮০ হবে বা, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের ধর্লা নদীর পারে ধর্লা নামের গ্রামে একবার আমার ফুপুর টাঙ্গাইল শহরে বসবাস করেন এমন আত্মীয়রা আমার এই হাতে বানানো শার্ট পরা লইয়া কিছু হাসাহাসি করছিলেন। আমি তখন দিনে-দুই-বই-শেষ-করা লেখকম্মন্য পাঠক। ওই বাড়িতে পাওয়া কৃষণ চন্দরের আমি গাধা বলছির অনুবাদ পড়তাম আর বিকালে যাইতাম নদী দেখতে। ফুপুর দেবররা ঢাকার সদরঘাট বাংলাবাজারে প্রুফ দেখতেন একটা সময়। হয়তো সে কারণেই অনুবাদ সাহিত্যের এই ধর্লা ভ্রমণ। তো নদীপাড়ে গেলেই আমার মনে পড়তো “তোমার বগা বন্দি হইছেন ধর্লা নদীর পারে রে!…“। তো ধললা নদী–ওই নামেই পার হইতাম নদী, যখন এলাছিন নাগরপুরে যাইতাম। ফলে হাসি আমারে ধরাশায়ী করতে পারে নাই। আমার সেই আমলের একটা ড্যাবডেবা ফটো আছে। খুঁইজা পাইতে হবে।

মুজিব যেদিন মারা যান সেদিন কী কারণে জানি না ছোট মামা আমাদের বাড্ডার বাসায় আছিলেন। বাড্ডায় আমাদের বাসাটা থাকতো রাস্তার পাড়ে।শীতে কয়েক ইঞ্চি পুরা ধুলার রাস্তায় অল্প গাড়ি চলতো আর গরমে প্যাক আর প্যাক। তাতে মানুষের পায়ের ছাপ গিজগিজ করতো। আর কাদার মধ্যে কী একটা গাছের বেগনি রঙের ফুল পইড়া থাকতো। বাসার চারদিকে বাঁশের বেড়া দেওয়া। পাশে বড় খালাম্মাদের বাসায় যাওয়ার জন্য খোলা জায়গা। এই বেড়া দেওয়ার সময় কামলা নেওয়া হইত। আব্বা তাদের সঙ্গে কাজ করতেন। তারা বাঁশ কাইটা বেড়া গাঁথলে পরে বাঁশের খুঁটি গাইড়া তাতে বেড়া লাগানো হইত। দুপুরে কামলারা খাইতে গেলে আব্বা আমারে রাস্তার ধারটায় দাঁড় করাইয়া ভিতর থিকা বেড়ার ফাঁকেতে তার দিতেন, আমি খুঁটির দূরত্ব আন্দাজ কইরা তার ফেরত দিতাম। আমরা তার বলতাম, আমার খালাত ভাইরা বলতো গুনা।

পেয়ারা গাছ থাকত একটা উঠানের পাশে, চাপকলটা থাকত তার নিচে। বড়ই গাছও একটা, বাড়ির সামনে ছিল, রাস্তা ঘেইষা। যুদ্ধের পরে যখন আমরা কুমিল্লা থিকা ঢাকায় আসলাম তখন আমার খালাতো ভাইবোনরা সবাই সার বাঁইধা ওই বড়ই গাছের নিচে দাঁড়ায় ছিল, যতদূর মনে পড়ে। তবে বড়ই গাছ নিজেও তখন ছোটই ছিল।

কাঠের একটা চেয়ার পাইতা রেডিও শুনতেছিলেন মামা। এর আগে ছোট খালাম্মা আর উনি মিলা একদিন দরজার দুই পাল্লায় চাপা দিয়া একটা বিড়াল মারছিলেন। বিড়ালের মরণ চিৎকারে আমরা ভাইবোনরা সন্ধ্যার পড়া থুইয়া হত্যাদৃশ্য দেখতেছিলাম। অনেক আনন্দ নিয়া ওনারা বিড়াল মারতেছিলেন। বিড়াল যতই ছটফটায় ওনারা দরজার পাল্লা শক্ত কইরা ধইরা ছিলেন, ছাড়েন নাই। মরার পরে প্রাণহীন বিড়াল দরজা থিকা ঝইড়া মাটিতে পড়ছিল। আমাদের বাসায় ছিল টিনের চাল, ফ্লোর মাটির, মাঝে মাঝে তা লেপা হইত। লেপলে মাঝারি মাঝারি বৃত্ত তৈরি হইত মেঝেতে। গোবর মেশানো কাদামাটির একটা গন্ধ তখন থাকত। সে আমলে এবং পরে আরো বহুদিন আমি ঘরের চালে উইঠা দূরের বর্ষা দেখতাম।

তো ছোট মামা উঠানে রৌদ্রের মধ্যে কাঠের চেয়ারে বইসা রেডিও শুনতেছিলেন। হঠাৎ শেখ মুজিবের হত্যাসংবাদ শুইনা চিৎকার দিয়া কান্দা শুরু করলেন। চোখ দিয়া পানি পড়তে ছিল তার।বয়স্ক লোকদের কান্না, এখনও দেখছি, কসমিক হতাশা তৈরি করে আমার মধ্যে। আর আমি তো তখনও বাচ্চা। তার কিছু দিন আগে আমার খালাতো ভাই মোহাম্মদ আলী ও লিয়াকত আলী শেখ মুজিবের লগে হ্যান্ডশেক কইরা আসছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব বাড্ডাতেই কোথাও খেলাঘরে আসছিলেন, বাচ্চাদের সঙ্গে হাত মিলাইতে। আমি কেন যে খেলাঘরে ভর্তি হইছিলাম না তখন তা নিয়া দুঃখবোধ হইছিল। খালাতো ভাইরা কথা দিছিল, এরপরে প্রধানমন্ত্রী আসলে আমারে হ্যান্ডশেক করতে নিয়া যাবে। ছোট মামার আহাজারি দেইখা বুইঝা ফেললাম এই জীবনে আর শেখ মুজিবের লগে দেখা হইতেছে না।

শৈশবের অপ্রাপ্তিজনিত দুঃখবোধ আমার আরেকবার হইছিল। সেইবার গেছিলাম দাদাবাড়িতে। কুমিল্লার বাশরা গ্রামে।আমি তখন বোধহয় ক্লাশ টু কি থ্রিতে পড়ি। স্কুলের ছুটিতে গ্রামে গেছি। মাসখানেক ছিলাম কি সেইসময়? সবচেয়ে খারাপ লাগতো সূর্য না ওঠা। আর পুকুরে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করতে হইত। বিকালেও সূর্য নাই। সেই সময় একদিন আমি আর আরেকটা ছেলে–নাম খাইয়া ফেলছি–টিনের চালে উইঠা শিম পাড়তে ছিলাম। নতুন টিন। পিছলা। এক সময় সঙ্গের ছেলেটা পিছলাইয়া স্লো মোশনে ঘরের চাল থিকা মাটিতে পইড়া গেল। পইড়া অজ্ঞান। তো লোকজন করলো কী ওরে ধইরা নিয়া পাশের পুকুরের পানিতে ফেলাইয়া দিল। পানিতে পইড়া সাতরাইতে সাতরাইতে ওর হাড়গোর ঠিক হইয়া থাকবে। ও সাতরাইয়া উল্টা পাশে গিয়া উঠলো।

সে সময়ই মনে হয়, একদিন আমি দাদির সঙ্গে গেছি কোনো এক আত্মীয়ের বাসায়। পাঁচ ছয় মাইল দূরে। দাদি আর আমি হাঁইটা হাঁইটা যাইতাম। অনেক ক্ষেত, রাস্তা, আইল, নদী, খাল, চক পার হইয়া আমরা যাইতাম। একদিন ওইখানে ছিলামও। গ্রাম আমার ভালো লাগতো না। বিষণ্ণ লাগতো। পরদিন ফিরা আইসা শুনি আব্বা আসছিলেন। আমারে না পাইয়া আবার চইলাও গেছেন। আমি এই ঘটনায় অনেক দুঃখ পাইছিলাম। একটা বিস্কুটের প্যাকেট আব্বা নিয়া আসছিলেন আমার জন্য। আমি সেই প্যাকেট হাতে নিয়া ফোপাইতে ফোপাইতে অনেক কানছিলাম। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বাচ্চা বয়সের দুঃখ অনেক গভীর, শারীরিক। কারণ বাচ্চাদের কোনো ওয়ে আউট থাকে না। দুঃখে বাচ্চাদের গলা আটকাইয়া যায়।

তো মুজিবের মৃত্যুর পরে বড় মামা নিঃশেষ হইয়া গেছিলেন। অন্য মামাদেরও দাপট কমতে থাকে। উনি আর দল বদল করেন নাই। পরে আওয়ামী লীগেরও কৃপা তিনি কেন জানি পান নাই আর।

মামারা লঞ্চ ভাড়া কইরা নারায়ণগঞ্জ ঘাট থিকা মতলবের ছেঙ্গার চরে যাইতেন। চুয়াত্তরে ওনাগো লগেই গেছিলাম আমরা–আমরা ভাইবোন তখন ছিলাম তিনজন; আর আম্মা। আব্বা ছুটিতে আসবেন।লঞ্চের জানালা থিকা নদীর ঘোলা ঘোলা পানি দেখতাম যাইতে যাইতে। আর ভট ভট শব্দ। লঞ্চ গজাইরা পার হইয়া ছেঙ্গার চর বাজারে ভিড়ত, ছোট মামা টুপ কইরা নাইমা যাইতেন। আর সবাই লঞ্চে বইসা থাকতাম। লঞ্চ অতি ধীরে ঘুইরা উল্টাপার্শ্বে আসলে দেখতাম মামা বাজারে পাবলিক মোলাকাত সাইরা লঞ্চে উইঠা আসছেন। তখন জিনিসটা বিভ্রম লাগতো। কেমনে যে উনি ডাঙায় নাইমা আবার লঞ্চে উঠতেন তা বেশ যেন হয় নাই হয় নাই লাগতো। আমি তো তখনও পৃথিবী গোল হইলে যে বাজারে নাইমা আবার চলন্ত লঞ্চেই উইঠা পড়া যায় তা জানতাম না। তো মামা নাইমা আবার কীভাবে লঞ্চে উঠলেন শৈশবের সেই বিস্ময়রে বয়স্ক লোকরা পাত্তা দিত না। ওই সময় অনেক দিন ছিলাম নানাবাড়িতে। তখন এই গানটা শোনা হইত। সকালের দিকে রোদ একটু উঠলে গানটা গাইত ছেলেটা। নিজে নিজেই। কেউ শুনতোও না সেইভাবে। পোলিও হইছিল বোধহয় ওর। উঠানে মাটিতে রাখলে ঠাণ্ডা লাগবে ভাইবা বোধহয় ঘরের চালে রইদে দিয়া রাখতো ওরে। ওইখানেই গানটা গাইত।

মামারা নাকি যুদ্ধের পরে রাজাকার ধইরা পুকুরে চুবাইয়া মারতেন। চুয়াত্তরে শোনা। বড় মামার ভোটের উপলক্ষে নানাবাড়িতে গেছি। মামারা হ্যাজাক জ্বালাইয়া নির্বাচনী আবহাওয়ায় বইসা থাকতেন। আমরা বাচ্চারা ঘরের কার থিকা দুর্ভিক্ষের টাইমে সাহায্য হিসাবে আসা স্বাস্থ্যবান ফুটা ফুটা বিদেশী বিস্কুট চুরি কইরা খাইতাম আর পটকা নিয়া উঠানে ফুটাইতাম। তেমন একদিন সন্ধ্যাবেলায় বন্দুক পরিষ্কার করতে ছিলেন মামার এক চাচাতো ভাই। তাদের ঘরের বারান্দায় বইসা। ওনার নাম বোধহয় ছিল মোস্তফা। তো তার বন্দুক থিকা গুলি বাইর হইয়া এই মামার—ফেরদৌস মামা– উরুতে গিয়া লাগে। পরে বস্তা বস্তা পাহাইড়া লতা চটকাইয়া তার রস দিয়া রক্ত বন্ধ করতে হইছিল।

একটা ঘটনা নিয়া বেশ উত্তেজনা হইছিল তখন। বাড়ির পাশ দিয়া যে খাল গেছে তার মধ্যে খাটা পায়খানা আছিল একটা। পানি বেশ নিচুতে। দুই পাশে ঝোপঝাড়। বাঁশগাছ। পাশাপাশি ফেলায় রাখা দুইটা মোটা বাঁশ দিয়া সেইখানে পৌঁছাইতে হইত। দুই কামলা মহিলারে কে জানি দেখছিল পায়খানা থিকা এক লগে বাইরাইতে। তা নিয়া বেশ উত্তপ্ত অবস্থা। আমরা বুঝতে পারি নাই এই নিয়া এত উত্তেজনা করার কী আছে!

বাড়ি থিকা একটু দূরে কবরস্থানে গেছিলাম একদিন। নানা-নানির কবর দেখতে। ওই একবারই কবর দেখছি ওনাদের। নানানানি বইলা কোনো স্মৃতি বা সম্পর্কের বোধ তৈরি হয় নাই আমার মধ্যে কখনো। তবে সৎ নানি আছিলেন একজন। কেউ একজন জ্বিনের গল্প করছিল। যে জ্বিনরা নাকি বাড়ির এক কোনা থিকা কবরস্থানে উইড়া আসে বড়ই কাঁটা হইয়া। এর পরে অনেক দিন আমি ভাবতাম যে আমি নিজেই বড়ই কাটা উড়তে দেখছি কবরস্থানের দিকে।

তো ওই গায়ক পোলার নাম আর মনে নাই আমার। গানটার বাকি লাইনগুলাও। এই গানটা আমার খুব প্রিয় একটা গান। শেখ মুজিবের নামও ঐ প্রথম শোনা। এখন তো ঐ নাম তেমন শোনা যায় না আর। এখন কেবলই বঙ্গবন্ধু।

২.
একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদ থিকা নামতেছি শাহবাগ যাব। সিঁড়িতে গান গাইতেছিলাম ‘মজিব কই রইলা রে’…। তো আমি তো বুঝি নাই নিচে হলরুমে সামওয়ান মুজিব একজন বইসা থাকবেন। উনি এই গান শুইনা ব্যক্তি আক্রমণ হিসাবে নিবেন। আর আমারে সেই দিনই শাহবাগে, সিলভানায়, ছোট গল্পকার সেলিম মোরশেদ আর ছোট কাগজ গাণ্ডীবের প্রকাশক হোসেন হায়দার চৌধুরীর সামনে ঘুষাইতে থাকবেন। তা বেশ আগের দিনের কথা। ১৯৮৯ সালের। ইশতিয়াক মুজিব অনেক দিন থিকাই কানাডায়। উনি বেশ লম্বা ছিলেন। ফলে তেরছা ঘুষি কম কম আঘাত করছিল আমারে।

৩.
১৯৮৯ সালেই বোধহয় আনোয়ার শাহাদাতের আসেদিনযায় পত্রিকায় প্রকাশিত একটা লেখার কারণে আমার বন্ধু ফাকরুল ইসলাম চৌধুরীর ফাঁসির দাবিতে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের মিছিল হয় শুক্রবার বাদ জুমা। ফাকরুল তখন অবস্থা রেকি করতে ইসলাম চৌধুরী নাম ধইরা গোলাম আযমের লগে সাক্ষাৎ কইরা আসছে। এবং ঢাকার খারাপ অবস্থায় সিলেট চইলা গেছে। আমার একদিন পরে যাওয়ার কথা। আমি অগ্রিম টিকেট কাইটা আইসা শাহবাগে বইসা আড্ডা দিয়া রাতে বাসায় ফিরছি। বাসায় গিয়া দেখি ট্রেনের টিকেট আর পাই না। সাজ্জাদ ভাইরে ফোন করলাম। যে ভুলে ওনার বইপত্রের লগে টিকেট গেছে কিনা। উনিও এই টিকেট দেখেন নাই। পরে ভোর চাইরটার সময় খুঁজতে আসছি শাহবাগে টিকেট–যদি পাই! দেখি নর্দমায়–পানিতে–ভাসমান–টিকেট–স্থির। হিঃ হিঃ, টিকেট ধুইয়া আমি কমলাপুর রওনা দিছিলাম। তখন ঐ সকালে বা আরো পরে ঐ একই জায়গায় এক টোকাইরে দেইখা বাক্যালাপের ইচ্ছা হইল। আমি জিগাইলাম–কারণ তখন অনেক এক্সপেরিমেন্ট আমার–আইচ্ছা বলো দেখি ‘সাহিত্য’ কারে বলে? সেই টোকাইর বাচ্চা টোকাই বলে কী: ”সাহিত্য অইল–তোমার বাসা কোথায়?”!

ঢাকা, ৭/২/২০১১ – ৬/৩/২০১১

লিংক >> facebook.com

free counters

মার্চ ৩০, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

এক লেখকের গল্প (২)

(আগের অংশ)

৮.
প্রতিদিনই আমার দুঃখের কথা শুনতে হচ্ছে। সেদিন দুঃখের কথা বলছিলেন সুধাময় বাবু। আজকে বললো আমার স্ত্রী। তার কেবলি মনে হয় তার আরো একটি বোন হওয়ার কথা ছিলো। হয় নি। যে হয়নি তার জন্য থেকে থেকে কেবল তার দুঃখ হচ্ছে। আমি বাসায় ফিরেছিলাম রাত এগারোটায়। ফিরে দেখি সে বারান্দায় একটা চেয়ারে গালে হাত বিছিয়ে বসে আছে। আমি ভাবলাম বুঝি আমার দেরি দেখে সে চিন্তিত হয়েছে। আমি বললাম, দেরি হয়ে গেলো সুলতানা, আমি একটু অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। সে বললো, ডাক্তার সাহেব এসেছিলেন, কালকে আবার আসবেন। সন্ধ্যার সময় তোমাকে থাকতে বলেছেন। আমি বিরক্ত হয়েছি বলে মনে হলো। বললাম, কেন ডাক্তারের আবার কী হলো?

আমি তার কী জানি আমাকে জিগ্যেস করছো কেন, বললো সুলতানা।

আমি একবার ভাবলাম তাকে সুধাময় সাহেবের কথা বলি। কিন্তু শেষে আর বলা হলো না। সে বললো তোমার সঙ্গে আমার জরুরী কথা আছে চলো খালপাড় যাই।

কেন খালপাড় কেন?

সে কিছু বললো না। আমি বললাম, ঠিক আছে দাঁড়াও। আমি ছুরিটা সঙ্গে নিয়ে নিই। সে হাসলো। আমি লন্ডনের বানানো একটা ছুরি পকেটে নিয়ে তার পিছন পিছন বের হয়ে গেলাম। তারপর সে দরজায় তালা লাগালো। আমি বললাম, সুরতানা তোমাকে আমি কতো ভালোবাসি তুমি জানো না। বলার সময় আমার কেমন হাসি হাসি লাগছিলো। কিন্তু আমি হাসলাম না। না হেসেই বললাম। দেখলাম সে চোখ বুঁজে আমার কথা শুনছে। তারপর সে আমার হাত শক্ত করে ধরে রইলো। আমার খুব খারাপ লাগছিলো। সে বললো, জানো, আমার না একটা বোন হওয়ার কথা ছিল। শেষে আর হয় নি। আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছিলাম বোন হবে। আমার মা তো ধরো রাজি হতে চাইছিলোই না। শেষে আমরা সবাই যখন মাকে অনেক কষ্টে রাজি করালাম। আবার বাবা সেই বোনের নাম রাখলেন জুলেখা। কেমন নাম?

আমি বললাম, ভালো।

কিন্তু সে বোন তো আর হয়নি আমাদের। ধরো আমার পেটে যদি একটা বোন হয় ওর নাম রাখবো জুলেখা, কী বলো তুমি। সুলতানা আমার হাত শক্ত করে ধরলো। এই হাতে সে নিশ্চয়ই ডাক্তারটার হাতও ধরেছে। আমি ঝাঁক করে হাত ছাড়িয়ে নিলাম। সে আমার হাত ছাড়তে চাইছিলো না। বলছিলো, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না! তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না!! আমি দেখলাম সামনে খালের পানি ছুটে ছুটে যায়। আমার তখন খুব সাহস হচ্ছিলো। আমার দূরসম্পর্কের ভাই না চাচার কথা মনে পড়ছিলো তখন। তার মাথার চুলগুলি ছোট ছোট করে কাটা। কানগুলি লম্বা লম্বা। আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম, মাগি, তোর বাঁচার কোনো দরকার নাই।

৯.
আমার চিৎকার শুনে সে তার দুই হাতে আমার মাথা জাপটে ধরলো। মাথার দু দিকে আস্তে আস্তে চাপ দিতে দিতে বলছিলো, এমন করে না, এমন করে না! সে হাতের আঙুল দিয়ে বাড়ি দিচ্ছিলো মাথায়। আমি তখন ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো। তাকে মনে হচ্ছিলো আমার স্ত্রী না। তাই একটু আকর্ষণও বোধ করছিলাম। খালপাড়ে শুকনা খড় বিছানো ছিলো। সে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সেখানে বসালো। আমার মাথাটা তার কোলে নিয়ে সে খড়ের উপর শোয়ালো আমাকে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার নাম কী? সে বললো সুলতানা। আমি তখন বললাম, আপনাকে আমার খুব ভালো লাগছে যে! সে তখন হাসলো। বললো, তোমাকে আমি কতো ভালোবাসি তুমি জানো না। তারপর সে আমার মাথাটা তার দু পায়ের ফাঁকে ভরে দিলো। তার শায়া, শাড়ি আর পায়ের চাপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। সে তার দুই ঊরু চেপে চেপে ধরছিলো। আমি বুঝতে পারছিলাম না সে কেন এমন করে। আবছা শুনছিলাম সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছে, আমি তোমাকে কতো ভালবাসি! আমি তোমাকে কত ভালোবাসি! আমি পকেটের ছুরিটা বের করার চেষ্টা করছিলাম তখন। তখন সে আমাকে তার ভেতর থেকে বের করে দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। সে বলছিলো, আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ! আর আমাকে জড়িয়ে জড়িয়ে ধরছিলো। কিন্তু আমার এসব ভালো লাগছিলো না। সে এরপর তার বুক খুলে ফেললো। বললো, নেও হাত দেও। হাত দেও। আমি কিচ্ছু বলবো না। সত্যি। সত্যি। সে আমার হাত নিয়ে তার স্তনের উপর ঘষতে লাগলো। আমার এসব ভালো লাগছিলো না। আমার কেবল মনে হচ্ছিলো আমার কোনো গল্পের চরিত্র বুঝি এই মেয়ে। কোন গল্প মনে করতে পারছিলাম না।

১০.
স্ত্রীকে আমার ভালো লাগছে না। এই স্ত্রীটি বদলানো দরকার। আমি আমার স্ত্রীর কাছে সুধাময় বাবুর মেয়ের কথা বললাম। আমি বললাম, সুধাময় বাবুর মেয়ের স্তনগুলি সুন্দর আর বড়। আমি তাকে বিয়ে করবো ঠিক করেছি। শুনে আমার স্ত্রী হাসলো। বললো, যাও করো গিয়া।

ও বোধহয় আমার কথা বিশ্বাস করে নি। আমি বললাম, মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে। সেদিন রাতের বেলা কয়েকবার আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে। আমার তখন খুব ভালো লেগেছিলো। আমিও কয়েকবার তাকিয়েছি। আমার স্ত্রী আমার কথায় মনোযোগ দিলো না।

১১.
সুধাময় সাহেবের সঙ্গে আজকে হাঁটতে বেরিয়ে ছিলাম। রাস্তায় দেখলাম চিনি না কিন্তু এ রকম লোক এসেছে পাচঁটা নাকি অনেকগুলি। রাস্তার পাশে একটা নিচু জমিতে লোকেরা মাটি ভরাট করছিলো। নৌকা করে কোথা থেকে জানি মাটি এনে ভরাট করে দিচ্ছে। আমরা একপাশে একটা ঘাট আছে সেখানে গিয়ে দেখলাম নৌকা সব মাটি আনে কেউ ওপাড়ে যাবে না। বিকাল হয়েছিলো সাদা হয়ে। বাচ্চাগুলি পানির পারে এসে চুইংগাম খায় দেখলাম। আগে এত বেশি বাচ্চারা ফর্সা ছিলো না। কিন্তু এখন দেখলাম ওরা অনেক ফর্সা হয়ে গেছে। সুধাময় সাহেব জিজ্ঞেস করলেন চুইংগাম খাবো কিনা। তিনি একটা চুইংগামবেচা লোকের কাছ থেকে চুইংগাম কিনলেন। চুইংগামের ভেতরের একটা সাদা কাগজ পানিতে ফেলে তিনি তাকিয়ে রইলেন। আমি বাচ্চাদের ছোটাছুটি দেখছিলাম। কাগজটা অনেক সময় ধরে ডুবলো না তাই আমরা ওখান থেকে চলে আসলাম। ডাক্তারটার সঙ্গে বাজারে আমার দেখা হলো। সে আমাকে ধরেই বললো, এখন কেমন আছেন। আমি কিছু বলবো না ঠিক করলাম। তারপর বললাম, ভালো। সে শুনে অল্প হাসলো। তারপর বললো, আপনি আমার চেম্বারে আসুন। আপনার একটা চেকআপ করানো দরকার। সুধাময় সাহেব বললেন, আমি মিষ্টির দোকানে অপেক্ষা করি, আপনি কাজ শেষ হলে আসুন।

তারপর ডাক্তারটা আমাকে নিয়ে গেল তার ঘরের মধ্যে। সেখানে আরো একটা লোক ছিল। ডাক্তার আলো অল্প করে দিলো। ডাক্তার আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করলো। আমি বললাম। তারপর সে আমাকে চোখ বন্ধ করতে বললো। কিন্তু যখনই সে কথা বললে আমার চোখ খুলে যায় তাই ডাক্তার রাগ করতে থাকায় আমার ভয় ভয় লাগছিল। শেষে আমার সামনে ডাক্তারটা তার আঙুল তুলে দেখাতে লাগলো। সে বললো, কয়টি আঙুল। আমি ইচ্ছা করে আঙুল একটা লুকিয়ে রাখলাম। তাতে ডাক্তারটার সম্ভবত ভালো লাগলো। সে শব্দ করে হাসলো। বললো, সব ঠিক আছে। আপনার বাসায় কালকে আসবো। একটা ডাক্তারের যে কতগুলি করে আঙুল! আমার রীতিমত কেমন কেমন লাগছিল যে তত যার আঙুল সে… তারপর কী যেন ভেবেছিলাম ভুলে গেছি। তবু ডাক্তারটা যে কেন তার আঙুল দেখালো আমাকে তা বলে নি। ডাক্তারটাকে আমি বললাম, আমার কাজ আছে আমি চলে যাবো। ডাক্তার বললো, ঠিক আছে ঠিক আছে যাবেন। তারপর হাসলো। তারপর আর হাসলো না। তখন আমি উঠে বেরিয়ে আসলাম। ডাক্তারটার ঘরে অনেকগুলি স্যান্ডেল। দেখলাম দুপুর চলে গেছে। তারপর এরপর আমি বাসায় যাওয়ার কথা ভাবলাম। পরে সুধাময় সাহেবের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল আর মিষ্টির দোকানে বসে থেকে দেখলাম সুধাময় সাহেব আসেন নি। তখন বাসায় চলে আসলাম। আমার স্ত্রীকে বললাম, আজকে ডাক্তারটার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সে আমাকে তার আঙুল গুনতে দিয়েছিলো। আমার স্ত্রী শুনলো না। সে বললো, ডাক্তার সাহেব কবে আসবেন বলেছেন? আমি বললাম, কালকে আসবেন। কখন আসবেন আমার মনে পড়ছিলো না, ডাক্তার কখনের কথা বলেছিলেন। আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতে আবার বের হতে গিয়ে দেখলাম আমার স্ত্রী বললো দরকার নেই, যখন খুশি আসুক কালকে সারাদিন তুমি বাসায় থাকবে।

১২.
আমি বাজারে গিয়েছিলাম সুধাময় সাহেবের খোঁজে। সুধাময় সাহেব ছিলেন না। দেখলাম বেশ কিছু হিন্দু ভদ্রলোক কী নিয়ে যেন কথা বলছে। আমি যাওয়ার পর আর বলে নি। আমি তাদের কাছে সুধাময় সাহেবের কথা আর জিজ্ঞেস করি নি। একবার ভেবেছিলাম সুধাময় সাহেবের বাসায় যাবো। শেষে কী মনে করে যেন যাই নি। না গিয়ে ভালো হয়েছে। বাসায় এসে দেখি বাগানে একা একা বসে আছে ডাক্তারটা। ডাক্তারটা ফর্সা আর লম্বা। আমার চেয়ে সুন্দর দেখতে। চোখগুলি মেয়েদের মতো। কয়েকদিন আগে একদিন স্ত্রীটি আমাকে জিজ্ঞেস করলো ডাক্তারকে আমার কেমন লাগে। আমি বলেছিলাম, ভালো। তখন সে বললো যে এই ডাক্তারটার মা এবং বাপ নেই।

ডাক্তারটা আমাকে দেখে বিরক্তি প্রকাশ করলো। বললো, আপনার না বিকেলে বাসায় থাকার কথা! তারপর বললো, আপনাদের দুজনের সঙ্গে একসঙ্গে কথা বলা দরকার।

আমি বললাম, ঠিক আছে।

আপনারা কতদিন হয় বিয়ে করেছেন, জিজ্ঞেস করলো ডাক্তার। আমি বললাম, ও আসুক, ও আসুক, ওকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ডাক্তারটা উঠে বাড়ির ভিতর চলে গেল সুলতানাকে ডাকতে। আমি উঠে ডাক্তারের ফেলে যাওয়া চেয়ারে বসলাম। ডাক্তারের নাম মনে করার চেষ্টা করছিলাম আমি। তখন আমার স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারটা বাগানের দিকে আসলো। দুইজনই দেখলাম আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি ডাক্তারটার চেয়ার থেকে উঠে ছোট কাঠের চেয়ারটায় বসলাম। ডাক্তার বসার পর সুলতানা ডাক্তারটার পেছনে দাঁড়িয়ে রইল। ডাক্তার সুলতানাকে বললো, আপনিও বসুন। ও বললো, না আমি দাঁড়ায় থাকি।

১৩.
সুধাময় সাহেব আরো বললেন, ডাক্তারটার ওখানে নাকি আমার স্ত্রীকে একদিন দেখেছেন। সকাল বেলায়। তাকে দেখে আমার স্ত্রী নাকি লুকিয়ে গিয়েছিলো। তারপর সুধাময় সাহেব বললেন, আপনার স্ত্রীর চরিত্র বোধহয় ভালো না। তার কথায় যুক্তি আছে। আমারও মনে হয় ওর চরিত্র ভালো না। ডাক্তারটার সঙ্গে বোধহয় ওর শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। আমি এ নিয়ে অবশ্য ওকে কিছু জিজ্ঞেস করি নি। সেদিন সন্ধ্যায় ডাক্তারটা চলে যাওয়ার পর থেকে বেশি বেশি গোসল করা শুরু করেছে সে।

১৪.
আমি ঠিক করলাম গ্রামে যাবো। স্ত্রীটি বললো, এখন গ্রামে যাওয়ার দরকার কী? আমি বললাম, দরকার আছে। গ্রামে যাবো। স্ত্রীটি বললো, ডাক্তার সাহেব তোমাকে বলেছে কোথাও যেতে না।

১৫.
রাতে বাগান থেকে লুকিয়ে রাখা কাগজগুলি তুলে একটা বস্তার মধ্যে ঢুকিয়েছি। ভোর বেলা যাবো ঠিক করেছি। আমার স্ত্রী জিগ্যেস করলো ব্যাগে এত কী জিনিস। আমি কোনো কথা না বলে তার দিকে কয়েকবার তাকিয়েছি। সে আর জিগ্যেস করে নি। সে আমার কাপড়-চোপড় একটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি এগুলোর মধ্যে লন্ডনের ছুরিটা নিয়েছি। আমার স্ত্রী বলছিলো এই ছুরি দিয়ে কী হবে? সাবধানে থেকো। সাবধানে থেকো। সাবধানে থাকার কথা কেন বললো বুঝতে পারলাম না। সকালে ঘুম ভাঙার পরে গ্রামে যাওয়ার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। সুলতানা মনে করিয়ে দিল। আমি বললাম, শুক্রবারে যাবো। বস্তা থেকে লেখাগুলি আবার বাগানে ঢুকিয়ে রাখতে হবে। রাতে স্ত্রীটি ঘুমিয়ে পড়লে এই কাজটা করতে হবে।

(চলবে)

free counters

মার্চ ২২, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

এক লেখকের গল্প

১.
গল্প লেখার যে কত সমস্যা তা নিয়ে ভাবছিলাম আমি। হাঁটতে হাঁটতে। গল্প লিখতে গিয়ে আমি কী করবো। এর মধ্যে সতেরোটি গল্প লিখেছি আমি। সতেরোটি বললাম আসলে লিখেছি সাতটি। তাও কোনোটিই পুরোপুরি শেষ হয় নি। এ নিয়ে একটু চিন্তায় আছি। আমার মৃত্যুর আগেই গল্পগুলিতে আমাকে স্থান করে নিতে হবে। ভাবছিলাম কোনো একটি গল্পে ঢুকিয়ে দেবো নিজেকে। আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি এসব ব্যাপারে। তিনি বলছিলেন এসব বাদ দেও। ডাক্তার দেখাও।

২.
কী বলবো নিজের সম্পর্কে। লিখেছি ভালোই। বার বার পড়ি গল্পগুলো। প্রতিদিন। আমার তো কাজ নেই আর। গল্প লেখা ছাড়া। অন্যের গল্পও পড়ি না এখন। বিরক্তি লাগে। যা সব বাজে গল্প। এর মধ্যে আমার এক দূরসম্পর্কের ভাই কিংবা চাচা হবেন এসেছিলেন, তাকে বলে রেখেছি যদি আমি মারা যাই… লোকজন বলে এটা নাকি সিজোফ্রেনিয়া। মনোবৈকল্য। হয়তো তাই হবে। আমি তো রাতে গল্প লিখি। রাতে লিখতে গেলে মনে হয় চরিত্রগুলো সব জ্যান্ত। দিনে লিখলে তেমন হয় না। রাতে চরিত্রগুলোর মুখে জুড়ে দেয়া কথাগুলি আমার কানে স্পষ্ট শুনি। তারা তর্ক করে আমার সঙ্গে। ভয় দেখায়। বলে, যার প্রাণ দিতে পারো না তাকে নিয়ে লেখো কেন। আমি ঠিক করেছি আর লিখব না। আমার স্ত্রীও বলে, এসব বাদ দেও। আমার স্ত্রী আসলে অসুস্থ লোক। আমি ওকে বলেছি এ কথা। ও শুনে হাসে। বলে, অসুস্থ তো তুমি। তোমার ডাক্তার দেখানো উচিৎ। ডাক্তার সে একটা ধরেও নিয়ে এসেছিল একদিন। শনিবার হবে। অল্প বয়স। সে ঘুরে ঘুরে আমার মাথাটা দেখলো। চুল দেখলো। কান নাক চোখ দেখলো। জিহ্বা দেখলো। মাথায় টোকা দিয়েছিলো ডাক্তার। দেখলাম ঢপ ঢপ শব্দ হয়। ভেতরটা ফাঁপা, ডাক্তার বললো। আমি বিশ্বাস করি নি। ডাক্তারটার সঙ্গে বোধহয় আমার স্ত্রীর অবৈধ সম্পর্ক আছে। দেখলাম সে আমার স্ত্রীর সঙ্গে কী সব কী সব বলে। আমি কাছে যাওয়ার পর আর বলে নি। আমি আমার স্ত্রীকে অবশ্য বুঝতে দেই নি যে আমি এসব বুঝে ফেলেছি। কেবল রাতে তার স্তনে টোকা দিয়ে দেখেছি ঢপ ঢপ শব্দ হচ্ছিলো। তারপর বলেছি ফাঁপা। আমার স্ত্রী অপমানিত বা ব্যথিত বোধ করেছে। সে এখন আর আমাকে তার স্তন ধরতে দেয় না। সে তার স্তন খোলেই না। বলে, যা করার নিচে করো।

৩.
আমার দূরসম্পর্কের ভাই নাকি চাচা তার কাছে এসব বলেছি। সে বললো, তোমার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দাও। আমার এই ভাই নাকি চাচাকে বলেছি, আমি মারা যাওয়ার পর আমার গল্পগুলি প্রকাশ করবে। যে অবস্থায় পাবে সে অবস্থায়। কিন্তু আমার ধারণা আমার স্ত্রী এগুলো পুড়িয়ে ফেলবে। আমি দূরসম্পর্কের কাছে এসব গচ্ছিত রেখে দেওয়ার চিন্তা করছি। সে থাকে গ্রামে। সেখানে গিয়ে এগুলো দিয়ে আসা দরকার। কিন্তু যদি আমার স্ত্রী এর মধ্যে ডাক্তারটির সঙ্গে আবার কিছু করে বসে এই ভয়ে যাই না। এর মধ্যে একদিন স্ত্রীটি ঘুমিয়ে পড়ার পর তার স্তন খুলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখছিলাম। আঙুলের ছাপ খুঁজেছি। পেয়েছিও মনে হয়। রেখাগুলির গতিপথ মুখস্ত করেছি। পরে ডাক্তারটার আঙুলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবো। কীভাবে দেখবো বুঝতে পারছি না। ডাক্তারটা তার আঙুলের ছাপ দেখাতে চাইবে মনে হয় না। সে ভাবে আমি বুঝি কোনো মানসিক রোগি। এই মনে করে সে আমাকে খুশি করার জন্য মিটি মিটি হাসে। একটা শয়তান। একে খুন করে ফেলা দরকার।

৪.
আজকে দুপুরে দেখলাম আমার স্ত্রীটি ঘুমুচ্ছে। এই ফাঁকে আমার গল্পগুলো একটা বাক্সে ভরে মাটির নিচে কবর দিয়ে রেখেছি। বিকেলে দেখলাম আমার স্ত্রী মাটিচাপা জায়গাটার কাছে গিয়ে কী যেন শুনবার চেষ্টা করছে। ওরা আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবে মনে হয় না। যদি বলে তবে খুব অসুবিধা। আমি এগুলো নিয়ে গ্রামে যাবো। কিন্তু যদি এর মধ্যে ও কিছু করে বসে। ওকে ওর মায়ের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া দরকার। কিন্তু ওর মা ওকে শাসনের মধ্যে রাখবে বলে মনে হয় না। ও আর ডাক্তারেরকথা বলে নি। বোধহয় বুঝতে পেরেছে আমি যে বুঝে ফেলেছি। ওকে মায়ের বাড়িতেই পাঠাবো। ওর মায়ের সঙ্গে আলাপ করবো যে ডাক্তারটার সঙ্গে ওর বোধহয় অবৈধ সম্পর্ক আছে। ওর মাকে কিছু টাকা দেবো দরকার পড়লে। যাতে ওর কাছে না বলে। তাতেই হবে। ওর মা খুব লোভী। দেখেছি সব সময়ই তার চোখ চক চক করে।

৫.
হাঁটতে হাঁটতে জীবনতৃষ্ণা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের কাছে আসলাম। সুধাময় ভদ্র নামের এক লোকের সঙ্গে দেখা হলো। চশমা পরা। বেশ বিনয়ী লোকটা। এই লোকের সঙ্গে আগে কয়েকবার দেখা হয়েছিল আমার। আমাকে দেখেই সালাম করলো ভদ্রলোকটা। চা খাওয়ার জন্য বললো। আমি তাকে বললাম যে আমি চা খাই না। শুনে খুব কিছুক্ষণ কাঁদলেন তিনি। একাশি সালে জিয়াউর রহমান সাহেব মারা যাওয়ার পর থেকে এই কান্নাকাটি শুরু হয়েছে ভদ্রলোকের। তিনি যেখানে সেখানে কাঁদেন। চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে তিনি কাঁদছিলেন। তার মুখ চেয়ে আমি খানিকটা চা খেয়েছি। তাতে সম্ভবত আমার নেশা হয়েছে। মাথা কেমন ঝিম ঝিম করছে। স্ত্রীকে বুঝতে দেয়া ঠিক হবে না। সুধাময় সাহেব কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়লেন। আমি পিছু পিছু উঠলাম। আমরা রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। ভাঙা সুরকির রাস্তা। মাঝে মাঝে রাস্তা ক্ষয়ে গর্ত হয়েছে। সেখানে পানি রাখা আছে দেখলাম। ফর্সা পানি। আমি সুধাময় সাহেবকে বললাম আমার স্ত্রীর কথা। বললাম, আমার স্ত্রী আমাকে তার স্তন ছুঁতে দেয় না। শুনে তিনি বেশ কষ্ট পেলেন। বললেন নদীর ওপারে নাকি পয়সা দিলে মেয়েরা স্তন ধরতে দেয়। আমি ঠিক করলাম নদীর ওপারে যাবো। আমি তাকে বললাম, সাবধান আমার স্ত্রীকে বলবেন না। তিনি বললেন যে বলবেন না। তখন তাকে বিশ্বাস করে ডাক্তারের কথাও বলেছি। তিনি বললেন, ডাক্তারকে খুন করে ফেলা দরকার। আমি বললাম, ডাক্তারটাকে আমি দেখতে পারি না।

আমি তাকে বললাম, আমার মাথা কেমন ঝিম ঝিম করছে। তিনি তার বাসায় নিয়ে গেলেন আমাকে। বারান্দায় একটা চৌকি পাতা ছিলো। কাজের মেয়েরা বোধহয় শোয়। সেখানে তিনি আমাকে শোওয়ালেন। তার স্ত্রী এবং মেয়ে আমাকে দেখতে আসলো। দেখলাম তার স্ত্রী চশমা পরে। মেয়েও চশমা পরে। আমার খুব ভয় লাগতে লাগলো। আমি বললাম যে আমি চলে যাবো। তারা শুনলেন না। জোর করে শুইয়ে রাখলেন। বললেন, এক ঘণ্টা পরে যাবেন। তার মেয়ে আসছিলো বার বার। বাচ্চা মেয়ে। কিন্তু স্তন বেশ বড়। সে আমার দিকে গভীর ভাবে তাকাচ্ছিলো। আমিও তাকাচ্ছিলাম। সুধাময় সাহেব বুঝতে পারেন নি। আমার একবার ইচ্ছা ওর স্তন ছুঁয়ে দিই। সুধাময় সাহেব কী মনে করবেন ভেবে দেই নি। আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, মা তোমার নাম কী? মেয়েটি বললো, বসুধা। তারপর জিজ্ঞেস করলাম তাদের কাজের মেয়ে আছে কিনা? সে বললো, আছে।

৬.
আমার অনেক ঘুম আসছিলো। ভাবলাম সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ি। পরে দেখলাম রাস্তা থেকে শো শো বাতাস আসে কেমন ঠাণ্ডা আর আমার স্ত্রী চিন্তাভাবনায় থাকবে আমি বাসায় যাই। তখন সুধাময় সাহেবের স্ত্রী গান গাইবেন ঠিক করলেন। আমি বললাম, গান গাওয়ার কী দরকার। তিনি শুনলেন না। জোর করেই গান গাইলেন। আমার মাথাধরা বাড়ছিলো। চোখের সামনে কেমন চারকোনা চারকোনা পাখিরা ঘুর ঘুর করছিলো। খুব বিরক্ত করছিলো। পরে দেখলাম পাখি না। পোকা এগুলো। সুধাময় সাহেবের স্ত্রী গান গাইবেন ঠিক করলেন। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন। বললাম, কী গান গা’বেন? তিনি বললেন, প্রেমের গান। শুনে সুধাময় সাহেব লাজরাঙা হাসি হাসলেন। তার গালে দেখলাম টোলও পড়ে। তাদের মেয়েও বসলো। মায়ের গাওয়া প্রেমের গান শুনে তার মুখ ঝুলে পড়ছিলো। সে আমার দিকে তাকাতে পারছিলো না।

সুধাময় সাহেবের স্ত্রী গাইলেন: যৌবন জলতরঙ্গে কত কল বসাইলেন মাধব / আমি কী করি কী করি ভেবে পাইলাম না / যাইলাম না সকল আশার কূলে / তরী ভাসাইয়া দেও রে দেও রে!

দেও রে দেও রে বলার সময় কান্নার আওয়াজ ঠিকরে বেরুচ্ছিলো ভদ্রমহিলার ভেতর থেকে। তখন সুধাময় সাহেবের চোখ ছলছলিয়ে উঠছিলো। তিনি থেকে থেকে গুঙিয়ে উঠছিলেন। আমি কয়েকবার বলেছি, খুব ভালো গান খুব ভালো গান। তখন তাদের মেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভালো লাগা প্রকাশ করেছে। তার গুটি গুটি চোখ খুব সুন্দর। চশমার ভেতরে চোখগুলি ভেসে বেড়াচ্ছিলো। ভালোবাসা ভালোবাসা একটা পরিবেশ আমি মনে হচ্ছিলো কতদিন আমার মন ভালো ছিলো না।

হঠাৎ শুনলাম পাশের ঘর থেকে কে যেন গুন গুন করে এদিকে সুর ছুড়ে দেয়। কাজের মেয়েটি বোধহয়। দেখলাম মিচকি মিচকি হাসছে একটা ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে বসলো। কিছুক্ষণ পর পর সে হাত সরায় তার সাদা সাদা দাঁত ঝক ঝক করে ওঠে। খানিক পরে তিনি আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন, খানকির বাচ্চা একদম চুপ। কেউ তার কথা শুনছে মনে হলো না। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোর সুলতানা কেমন আছে? সুলতানার কথায় ভদ্রলোকটাকে আমি চিনতে পারলাম। সুলতানা নামের একটা মেয়ের সঙ্গে আমার একটা গল্পে এই ভদ্রলোকের প্রেম হয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। আমি বার বার বলছিলাম, আমার সামনে কেউ নেই, আমার সামনে কেউ নেই।

৭.
ঘুম থেকে জাগিয়ে আমাকে সুধাময় সাহেব বললেন, চলুন বাসায় দিয়ে আসি আপনাকে।

সুধাময় সাহেবের স্ত্রী বললেন, দাদা তো অনেক ঘুমান।

সুধাময় সাহেবের স্ত্রীর কথাবার্তা আমার ভালো লাগলো না। তিনি কী বলতে চান বুঝতে পারলাম না। তিনি কি আমাকে ঘুমাতে মানা করলেন। ভদ্রমহিলার গলা কেমন জানি। আমি তাই গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বললাম, দুঃখিত আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আসলে খুব চিন্তা করি যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মন খুব কেমন যে থাকে সারাদিন। আরেক দিন আপনার গান শুনবো। খুব ভালো গান। আপনি এসব কোথায় শিখলেন। কীভাবে শিখলেন।

সুধাময় সাহেবের স্ত্রী বললেন, আপনি তো আমার গান শুনলেনই না। আরেক দিন আসবেন আপনাকে ভালো ভালো গান শুনিয়ে দেবো।

কিন্তু কোথায় শিখলেন। বলে আমি সুধাময় সাহেবের মেয়ের দিকে একবার তাকালাম। তারপর সুধাময় সাহেবের দিকে তাকালাম। তারপর আবার তার মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, মা তুমি গান পারো না? তখন সুধাময় সাহেবের স্ত্রী বললেন, গান আমাদের পারিবারিক জিনিস। আমার বাবাই আমাদের গান শিখিয়েছেন। তারপর সুধাময় সাহেবের মেয়ে বললো, গান মা যেগুলো শিখিয়েছে সেগুলোই পারি। কিন্তু গাই না।

কেন গাও না মা?

তখন সুধাময় সাহেবের স্ত্রী বললেন, ওর বয়স হয় নি তো। এখন যদি এসব গান ও গায় শেষে সেটা ঠিক হবে না। ওকে আমি সব গানই শিখিয়েছি। বয়স হলে আস্তে আস্তে গাওয়া শুরু করবে।

তখন সুধাময় সাহেবের মেয়ে বললো, আমার বিয়ে হলে তখন সব গানই গাইবো। না মামনি?

তার মা বললো, হ্যাঁ, তাই তো।

(চলবে)
free counters

মার্চ ২০, ২০১২
by ব্রাত্য রাইসু
Comments Off

নদীমধ্যে গুরুসঙ্গ: আ জার্নি বোট ১৫

বলে… যেই গুরু বসতে যান

দুই দুইটা চেয়ার বসাইয়া দেয় তারা

ফলে গুরু কিংকর্তব্যবিমূঢ় না হইয়া

আলতো ভাসমানতার সঙ্গে

আলগোছে শুইতে যান

এক চেয়ারে দুইটা ঠ্যাং

এক চেয়ারে মাথা

 

কিন্তু এই হুগনা চরে কাঠের চেয়ারে

বালিশ লাগানো নাই

গুরুমুণ্ডু ব্যথা পাইবে

তেই রকম যৌথ ভাবনায়

দুইটি নারী চারটি হাত পাইতা দিল

গুরুকেশগুচ্ছের তলায়

 

বাট তো, গুরুমুণ্ডু নারীহস্তে শায়িত হবে না…

 

এমন অনিচ্ছা নাকি ইচ্ছা থিকা গুরুর গভীর দেহ

দুইটি ঘণ্টা ভাইসা রইলো চর আর চেয়ারের উপরে।

২৫/১১/২০১১

free counters