একদিন আহমদ ছফার বাসায় আমরা

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আশীষ খন্দকার, ব্রাত্য রাইসু, শাহ্‌রীয়ার রাসেল

[১৯৯৬ সালে এক রাতে পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। তখন লেখক আহমদ ছফার বাংলামোটরের চারতলার ভাড়া বাসাটি ছিল তরুণ-প্রবীণ লেখকদের আড্ডাস্থল। ঢাকার শাহবাগের আজিজ মার্কেটের দুই তলায় আড্ডা দেওয়ার জন্য ছফা একটি দোকানও ভাড়া করেছিলেন। এর নাম ছিল উত্থানপর্ব। পাশেই তিনি গরীব বাচ্চাদের একটি স্কুলও খুলেছিলেন। বিকেলে ছফা শাহবাগে বসতেন। বিবিধ বন্ধু এবং চাকুরিহীন ও চাকুরি আছে এমন তরুণ কবি- সাহিত্যিকরা তখন তাঁর কাছে আসতেন। শাহবাগের আড্ডা শেষে প্রায়ই সে আড্ডার কেউ কেউ ছফার সঙ্গে বাসা পর্যন্ত হেঁটে এগিয়ে দিতেন তাঁকে। কোনোদিন তাঁর বাসায়ই আড্ডা বসতো। র চা ও পনির দিয়ে আপ্যায়ন করতেন ছফা। আমরা যারা তাঁর একটু ঘনিষ্ঠজন ছিলাম তাদেরকে তিনি কখনো-সখনো তাঁর জার্মান বান্ধবীর কল্যাণে প্রাপ্ত নেপোলিয়ন ব্যবহার করতে দিতেন। র চায়ে দুচামচ ব্র্যান্ডি আর পিরিচে কাটা পনির এটি ছিল সে সময়ের ডেলিকেসি।

প্রায় সব বিষয়ে ছফা মত দিতেন। সবার সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক বজায় ছিল তাঁর। শোনা যায়, গোপনে কাউকে কাউকে অর্থসাহায্য করতেন। সাক্ষাৎকারটি শুরু হয় নাট্যকার ও অভিনেতা আশীষ খন্দকারের একটি প্রশ্ন দিয়ে। ক্যাসেটে সে প্রশ্ন ধারণ করা যায় নাই এবং অনেক পরে রেকর্ডার থেকে শুনে শুনে সাক্ষাৎকারটি লেখা হয়েছে বিধায় ছফার কথা দিয়েই সাক্ষাৎকারটি শুরু করা হলো। — ব্রাত্য রাইসু, ২/৭/২০০৮]

১৯৯৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফরকালে আহমদ ছফা, সঙ্গে ব্রাত্য রাইসু। ছবি: ইকবাল খান চৌধুরী

১৯৯৫ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফরকালে আহমদ ছফা, সঙ্গে ব্রাত্য রাইসু। ছবি: ইকবাল খান চৌধুরী

আহমদ ছফা: আরে না, আমি মুন্ত্রী হয়ে গেছি তো। আমি মুন্ত্রী তো, উল্টাপাল্টা প্রশ্নের জবাব দ্যাব না।

আশীষ খন্দকার : ছফা ভাইয়ের ওপর একটা ডকুমেন্টারি করে রাখতে চাই, ফিল্ম ডকুমেন্টারি।

ছফা: কর্নেল ফরহাদের (ফরহাদ মজহার) একটা ডকুমেন্টারি ইউনিট আছে।

ফরহাদকে বললে যে কোনোদিন… প্রতিদিনই রিকোয়েস্ট করছে আমাকে, ওদের একটা ভিডিও ক্যামেরা আছে, ইত্যাদি আছে…কিন্তু এগুলোর করার একটা বিপদ আছে কী জানো, খুব তাড়াতাড়ি বোধহয় মরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

আশীষ: এটা করতে গেলে খুব শিল্পসম্মত ডকুমেন্টারি করতে হবে। তথাকথিত যেসব বায়োগ্রাফির ওপর ডকুমেন্টারি হয়, সে ধরনের কাজ না।

ছফা: আমি একটা জিনিস ভয় পাই। ভয় পাই কী জানেন, অর্থাৎ ডকুমেন্টারি করা যায় কেমনে, একজন লেখক কিংবা ক্রিয়েটিভ লেখক আনকনশাসলি করলে ভালো। কিন্তু আমি তো এখন জানতে পারছি সব।

শাহ্‌রীয়ার রাসেল : এমনি নরমালি করলে অসুবিধা কী?

ছফা: আমি জানতে পারতেছি তো আমার পাবলিসিটি হচ্ছে! তখন তো এতে কোনো মজা নেই আর। Read More

j j j

আমি তো সারা জীবন দিয়া গেছি–সারা জীবন দিয়া এক্কেরে ফকির হইয়া আমি একা থাকি! — ফয়েজ আহ্‌মদ (২০০৬)

[পরিচিতি: ফয়েজ আহ্‌মদ - উইকিপিডিয়া]

ফয়েজ ভাইয়ের লগে আমার ভালোবাসার শুরু সেই চুরানব্বই পঁচানব্বইর দিকে। আমি তখন বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করতাম। উনি তখন মগবাজারে থাকতেন। ভাইগ্না-ভাগ্নিদের সঙ্গে সম্ভবত। তাঁর শিল্পাঙ্গন তখনও বিখ্যাত। ডিকটেশন নিতে আসতাম বাংলাবাজার পত্রিকার তরফ থিকা। একটু দূরে সোফায় আধশোয়া হইয়া, টুলে চরণ মোবারক রাইখা কথা বলতেন ফয়েজ ভাই। তাঁর বয়স্ক পা সমুদয় প্রথমে দৃশ্যগোচর হইত। উনি নিশ্চয়ই ডিকটেশনগ্রহীতাদের মুখই দেখতে পাইতেন সর্বদা। তাঁর কণ্ঠস্বরে একটা ক্যা-খ্যা ধ্বনির সমারোহ থাকত। পরের কথাটি আগেই বইলা ফেলতে চাওয়ার কসরতের কারণে হবে–বাক্যের মইধ্যে দ্রুত আর বিলম্বিতের মিশ্রণ ইত্যাদি ঘটত। বাক্য বেশি ঘনীভূত হইয়া গেলে এক বাক্য দুইবার বলতেন। ফয়েজ ভাইয়ের ধ্বনিকর্কশতার কাছাকাছি ধ্বনি ছিল যতদূর দেখছি ছফা ভাইয়ের। দুইটা কণ্ঠস্বরই আমার কাছে খুব মধুর লাগত, তখনই।

ফয়েজ ভাইয়ের দুরবস্থা কবে শুরু হইছিল আমি জানি না। ২০০৬-এর দিকে তাঁর ধানমণ্ডির ভাড়া বাসায় গিয়া এই ইন্টারভিউ নেই। উনি একলা থাকতেন আশ্রিত লোকজনদের সঙ্গে।

বেশ পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আগ্রহে কবি ও আলোচক রেজাউল করিম সব মিলাইয়া প্রায় ৩০/৪০ ঘণ্টার ইন্টারভিউ নিছিলেন ফয়েজ ভাইয়ের। ওগুলার থিকা আগপাছ কইরা থিম মিলাইয়া কিছু তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এ খণ্ডিত জীবন নামে ১০ কিস্তিতে প্রকাশ করছিলেন। মূল্যবান সেই জীবনী ইন্টারভিউগুলার বাকিগুলা বিডিনিউজ বা রেজাউল করিম আর প্রকাশ করেন নাই। আমার এই ইন্টারভিউটা মেইনলি ফয়েজ ভাইয়ের একলা জীবনের হাহাকার নিয়া গঠিত। তিনি আমারে প্রায়ই জিগাইতেন আমি কই থাকি। যাইতে বলতেন বাসায়। আমি দুই তিনবার গেছিও। যাইতে যেই রকম অনুরোধ করতেন, গেলে পরে অন্য লোকেরা আসলে তেমন পাত্তা দিতেন না। ফলে তেমন আর যাওয়া হয় নাই।

মইরা যাওয়ার একদিন আগে–২০ ফেব্রুয়ারি ২০১২–তিনি ফোন করলেন দুপুর বেলায়। আমি জিগাইলাম, “কী, টাকা দেয় নাই এখনো।” ওনার কিছু পাওনা টাকা নিয়া একটা গড়িমসির ব্যাপারে উনি আমারে বলছিলেন। আমি ভাবলাম সেই ব্যাপার। তা উনি বললেন, “আরে দুরো মিয়া–খালি টাকা টাকা করো। আমার কী আর কোনো ব্যাপার নাই! শোনো আমার মধ্যরাতের অশ্বারোহীর অখণ্ড সংস্করণ বাইর হইছে। তোমারে এক কপি দিতে চাই। নিতে আসবা নাকি?” আমার বাড়ি থিকা ওনার বাড়ি ৫ মিনিটের হাঁটা পথ। তবু ভাবলাম গিয়া কী লাভ! আমি একজনরে পাঠায় দিলাম বইটা নিয়া আসার জন্যে। ফয়েজ ভাই বইয়ে লেইখা দিছেন, “প্রিয় রাইসুকে–ফয়েজ আহ্‌মদ ২০১২।” মোটা সুন্দর কভারের বই। অনন্যা বাইর করছে। আমি প্রীত বোধ করলাম। ফয়েজ ভাইরে ফোন কইরা জানাইলাম, “বই পাইছি, ফয়েজ ভাই!” তিনি বললেন, “যাউক, তোমারে দিতে পারলাম, বাসায় আইসো।” পরদিন তিনি মারা গেলেন।

– ব্রারা ৩১/৩/২০১৩

ফয়েজ আহ্‌মদ (); ছবি. ব্রাত্য রাইসু ২০.১০.২০১০

ফয়েজ আহ্‌মদ (২.৫.১৯২৮ – ২০.২.২০১২); ছবি. ব্রাত্য রাইসু ২০.১০.২০১০

ফয়েজ আহ্‌মদ: আমার ছয়টা ক্যামেরা আছিল, দিয়া দিছি। এখন একটা ক্যামেরা হাতে রাখার জন্য, মৃত্যুর আগে…

ব্রাত্য রাইসু: মৃত্যুর আগে ক্যামেরা রাখবেন কেন?

আমি কোথাও যাইতে পারি না, বারো পদের ছবিটবি তুইলা সময় নষ্ট করতাম আর কি। আর রেকর্ডার আমার ছিল চাইর পাঁচটা। একেক সময় একেকটা ছিল রেকর্ডার। এগুলি এত ভাল ছিল না তখন। তখন একটু বড় ছিল, একটু বড়। ভালোই কাজ করতো। তারপরে সেগুলা তো ছেড়ে দিলাম। রিপোর্টিংও ছাড়লাম। আস্তে আস্তে গেল। ভাইয়ের বেটা বোনের বেটাগো দিলাম। ক্যামেরা ছিল ছয়টা। ভাইয়ের বেটাগো দিয়া এখনো আছে একটা। এইটা আমার একটা মেয়েকে দিয়ে দেব। ছোট ক্যামেরা একটা কিনব। কত টাকা দামে পাওয়া যায়?

ছোট… ভালো ক্যামেরা তো বিশ হাজার টাকার কাছাকাছি।

হুর মিয়া, মরণের আগে আমি বিশ হাজার টাকা দিয়া দেব? মরণের আগে আমি বিশ হাজার টাকা দিয়া ক্যামেরা কিনব!

তো মরণের আগে আপনি এত টাকা দিয়া করবেন কী?

আমার টাকা কোথায়, বলো?

আপনের টাকা নাই?

নাহ। আমাকে বলো, বইলা দেও যে আপনের… আমার তো আয় নাই কোনো।

আপনি নাকি আগে অনেক ক্যালেন্ডারের বিজনেস করতেন, ওইখানে আয় হইছিল না, ঐ টাকা নাই?

সে তো আজকে থেকে পনের বছর বিশ বছর আগে। যখন আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম। ওই সময়টা আমি তিন-চার বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলাম। তো আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার সময় পারিবারিক…সংসার চালানো, নিজেকে চালানো অনেক কঠিন ছিল। তখন আমি তিনটা না চারটা ক্যালেন্ডার করছিলাম। কুড়ি বছর আগে।

ক্যালেন্ডার বিজনেস ছাড়ছেন কবে আপনি?

ওই কুড়ি বছর আগে। তিন বছর করছিলাম।

এখন কি টাকা-পয়সা কম নাকি আপনের?

হ্যাঁ, আমার তো টাকা-পয়সা কমই। লিখে-টিখে পাই কিছু। লিখে-টিখে কয় টাকা হয় বুঝতেই পারো। কয় হাজার টেকা দেয় একটা লেখা লিখলে?

আপনি কোন কোন পত্রিকায় কত টাকা পান?

আমি পাই এখন যুগান্তর আর আমার দেশ…আর আজকের কাগজে কিছু পাইতাম। সেটা কম দিত। ওরা দেড় হাজার টাকা দিত। বাড়ায়-টারায় নাই। আমিও আর লেখি না এখন। বছর খানেক যাবত লেখি না। কারণ একই লেখা যদি আমি লেখি আমার দেশ বা যুগান্তরে আমি পাই আড়াই হাজার তিন হাজার টেকা। আমি ওইখানে দেড় হাজার টেকায় কেন দিব। লেখা তো একই, শ্রম তো একই। আমি কেন দেব, কী কারণে দেব বলো।

ভালোবাইসা দিলেন।

ভালোবাইসা বড়লোক করব তারে আমি। টাকা তো পরেরটাই চায় সে। সব বড়লোকই পরের টাকা চায়। আমার কোনো আয়ব্যয় কিছু নাই। আমি মিনিমাম কস্ট-এ থাকি। আর খাওয়া-দাওয়া করি অল্প কইরা। এই। পত্রিকা-টত্রিকায় লেইখা-লুইখা কোনো মাসে ১০ তারিখে কেউ দিল, ১৫ তারিখে কেউ দিল, এইটা তো চাওয়াও যায় না বারে বারে। জনকণ্ঠে আমি লেখলাম ১০ বছর অন্তত। এই জনকণ্ঠ এখন আমার কাছে লেখা নেওয়ার জন্য লোকও পাঠায় না! সে কয় আমাদের লোক নাই, টাকা দিয়া রাখতে পারব না, আপনি লিখে পাঠায় দেন। এক বছর আগ পর্যন্ত লেখছি, তারপর আর লিখি না এখন। কারণ আমার কাউকে রাখার মতো টাকা নাই। ওরা এখন এক বছর পরে বিল দেয়।

এইটা তো ঠিক না। আপনের হয়তো সব টাকা না পাইয়াই মইরা যাইতে হবে।

আমার তো এখনও জনকণ্ঠের কাছে বিশ-পঁচিশটা লেখার টাকা পাওনা।

ওইটা দিতেছে না কেন, এক বছর পরে দিবে?

না দেয় আর কি, যখন যা ইচ্ছা। হয়তো দুই হাজার, এক হাজার, তিন হাজার। তাও কম। যা হওয়া উচিত তার চেয়ে কম। এখন কী করব। এইজন্য আর লেখি না।

তো এখন কী লিখতেছেন আপনি?

এখন ওই আমার দেশ-এ কারেন্ট এফেয়ার্স-এ লিখতেছি, আর অতীতের কাহিনী-টাহিনি কিছু। আর যুগান্তরে কারেন্ট এফেয়ার্সে লিখি। আর আমার কাছ থিকা মানবজমিন নেয় দুয়েকটা লেখা। আরেকটা জানি কোন কাগজ নেয়, ভুইলা গেলাম। জনকণ্ঠে আর লেখি না। আর একটা লোক কতই বা লেখতে পারে, তুমি বলো।

এখন কি লেখা ছাড়া আপনের উপার্জনের আর কোনো পথ নাই।

আর এখন নাই। কারণ আমাকে তো কেউ চাকরি দেবে না এই বয়সে। প্রশ্নই ওঠে না। আমি কেমনে বলব যে এই বয়সে আমাকে একটা চাকরি দেও। কইতে পারুম না, তারাও আমার কাছ থিকা বাঁচতে গেলে পারে না বয়সের জন্য। কয় একটা লেখা লেখেন টেকা দেই, দুইটা লেখা লেখেন টেকা দেই। প্রতি সপ্তাহে লেখেন টেকা দেই। তো প্রতি সপ্তাহে তুমি লেখলে, আড়াই হাজার টেকা কইরা পাইলে চাইর সপ্তাহে চাইরটা পাইলা…জনকণ্ঠের টেকা পাইলা। তোমার বাড়িভাড়া কত?

এইখানে কত দেন আপনে?

খুব কম। বাড়িওয়ালা নেয় ১২ হাজার না কত। ইলেক্ট্রিসিটির টেকা তো আমি দেই না। খুশি হইয়া দেয় যে আমি তার বাড়িতে থাকি। তার ধারণা আমি নাকি খুব ভালো মানুষ। এইজন্যে সে মনে করে যে টাকাটা আমি না দিলেই কী…বলে, ‘দেন যে আপনে এই তো বেশি। এবং আপনে আমাকে মিনিমামটা দেন।’ তো মিনিমামটা দেই। আর খাওয়া-দাওয়া আছে না। আর চিকিৎসা…পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার ওষুধ আমার লাগে। এই তো কয়দিন আগে আমি জুন মাসে ছিলাম হাসপাতালে দশ দিন। অজ্ঞান অবস্থায়ই ছিলাম পাঁচ দিন। আর ফিরা নাও আইতে পারতাম। আমি হয়তো অজ্ঞান হইয়াই মারা যাইতাম। ফিরত আইছে জীবনটা পাঁচ দিন পরে ছয় দিনের দিন। তারপরে আমি দশ দিন পর্যন্ত থাইকা চইলা আইছি। চইলা আসতেছি তখন আমাকে বলে আপনে একজন নার্স নিয়া যান। তো আমাকে একজন নার্স দিল। মাসের বেতন দিছি, খাওয়া দিছি, থাকতে দিছি ওই নেক্সট রুমে। এইখানে একটা হাসপাতাল আছে কী জানি…?

‘শমরিতা’।

হ, শমরিতা হাসপাতালের নার্স। ময়মনসিংহে বাড়ি, উপজাতীয় মহিলা। আমার এক আত্মীয়ের রিকোয়েস্টে সে নার্স হইয়া আইল, চাইর মাস থাইকা এই তো গত মাসে গেছে। এখন অষুধ কইমা গেছে বইলা আমার এইখানে যে ছেলেমেয়ে দুইটা কাজ করে তারা এখন আমারে খাওয়াইতে পারে। সুতরাং তারে বাদ দিছি। আর হে-ও থাকতে চায় না। কণ্ট্রাাক্টই ছিল তিন মাস, এক মাস অতিরিক্ত ছিল। কারণ তার তো পারমানেন্ট জবে যাইতে হবে। সেইজন্য।

আপনের কি যোগাযোগ নাই আর কারো সঙ্গে, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে?

নাহ্। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ খুব কম।

হেরা পয়সা দেয় না আপনেরে?

পয়সা দেবে কেন?

হেগোরে দেন নাই আপনে কহনো টাকাপয়সা?

টাকা দেবে কেন? কারো আত্মীয়স্বজন টেকা দেয় নাকি? তোমাকে দেয় তোমার আত্মীয়স্বজন?
না দেয় না।

হাঃ হাঃ। কিন্তু আপনি তো দিছেন।

আমি তো সারা জীবন দিয়া গেছি–সারা জীবন দিয়া এক্কেরে ফকির হইয়া আমি একা থাকি!

কেমন লাগে একলা থাকতে?

খুব ভালো লাগে আমার। মাঝে মাঝে ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে খুব ভালো লাগে। কে-উ নাই কিছু আসে যায় না। এই ছেলেমেয়ে দুইটা অশিক্ষিত, গ্রামের, ফাইভ সিক্স পর্যন্ত পড়ছে, দুই ভাইবোন…।

কী নাম ওদের?

কী কী জানি নাম। আছিল অন্য অন্য দল। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে এরা আইছে আর কি। এরা আছে বছর খানেক যাবত। আবার এরা চইলা যাবে, তখন নতুন দল আসবে।

(২.৫.১৯২৮ - ২০.২.২০১২)

(২.৫.১৯২৮ – ২০.২.২০১২)

২.
আপনের সঠিক জন্মতারিখ জানেন নাকি আপনে?

হ্যাঁ, তারিখ জানি। এখন তারিখটা নিয়া গণ্ডগোল আছে একটু। তারিখ বোধহয় দোসরা মে। অনেক আগে বাইরাইয়া গেছে। আমি দেই নাই কাউরে, কীভাবে কীভাবে জানি বাইরাইয়া গেছে। একটা ডেট আছে থার্টি, আরেকটা টুয়েন্টি এইট-ঠেইট সেভেন-টেভেনের দিকে। ফ্যামিলি ট্রি আছে আমার বাড়িতে একটা। কে কবে জন্মগ্রহণ করছে। তাতে পুরাতন খবর পাওয়া গেছে একটা। তাতে আমার দেখা যায় বেশি। আর আমি যেইটা জানি অফিসিয়ালি সেইটা থার্টি।

আপনে কোনটা পছন্দ করছেন?

পছন্দ…যেইটা হয়। এই বয়সে আর কী?

তাইলে আপনের বয়স কত হইল হিসাব অনুসারে?

হিসাব অনুসারে আমার বয়স তো প্রায় সাতাত্তর চলছে। একটা হিসাবে। আরেকটা হিসাবে বাড়লে আমার আশি হয়-ঊনআশি।

এখন আপনে কীভাবে দেখতেছেন দুনিয়াদারি? বিয়া তো করেন নাই আপনে।

নাহ। বিয়া তো দুই রকম। দুই রকমে অবিবাহিত হয় মানুষ। এক রকম না। এইটা জানো তো?

না, আমি জানি না।

আচ্ছা, এক রকম হচ্ছে সে বিয়া করে নাই। অকৃতদার। কোনো সময়েই সে বিয়া করে নাই। তার তো এই সম্পর্কে জ্ঞান নাই। আরেকটা হইল, সে বিয়া করছিল। সেই বিয়া তালাক হইয়া গেছে, একটা বাচ্চা আছে। বা আদৌ বাচ্চা নাই।

বউ মইরা গেছে…?

বউ মইরা গেছে। তারপরে কয়, দুর আর করুম না। এই রকম আছে। নানা রকম। দুইটা বাচ্চা নিয়া স্বামী। স্ত্রী ভাইগা গেল গা। আরেকজনের সাথে। সেইটা বড় সাংঘাতিক। আরেকজনের সঙ্গে ভাইগা যাওয়াটা…

রবীন্দ্রনাথের গল্প আছে তো এই রকম। এক অধ্যাপকের স্ত্রী ভাইগা যায় গা যে।

তো আছে না? পৃথিবী সারা জীবনই চলছে এই রকম। খালি একজনই ঠিক মতন তার বউকে রাখতে পারছিল। বিকজ অন্য পুরুষ আর পৃথিবীতে ছিল না তখন।

আদম সাহেব?

হ, আর পুরুষ ছিল না বইলা রক্ষা। কারণ আর পুরুষ থাকলে আর থাকেনি অত সুন্দর বউ।

আদমের বউ অত সুন্দর ছিল তার কি কোনো রেকর্ড আছে?

যাই হোক, আমরা কল্পনা করি এইটা। আমরা ধইরা নেই এই লোকটা সুন্দরই হবে। এই রকম দাড়ি হবে তার। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। এবং তার বউটি অসাধারণ হবে। এবং নাক তার লম্বা…অমুক তমুক এই সমস্ত হবে। এইগুলি আমরা কল্পনা কইরা করি। কল্পনা কইরা যা দেখছি তাতে দেখা গেছে যে সে খুব সুন্দর।

কে, মিসেস হাওয়া?

মিসেস এনিবডি। এখন আমরা সৌন্দর্য পরিমাপ করি…কার কত সৌন্দর্য, কে কত সুন্দর, কেন সুন্দর, এটা-ওটা…নানা রকম বিচার-আচার করি আমরা। আমার ইচ্ছা আমি করি, তুমি আমাকে মানা করার কে?

না, সেইজন্যেই জিগ্যেস করলাম, আপনি বিয়ে করলেন না কেন?

হ্যাঁ, তুমি আমাকে বিয়ে করতে বলারও কে?

না, বিয়ে করতে বলতেছি না। কোনো কারণ আছে কিনা, জিগ্যেস করলাম। আপনের ইচ্ছা হইলে বলবেন।

সব কিছু কারণে ঘটে না। কোনো কারণে ঘটে নাই। আমি মনে করি এইটাই ঘটছে…কারণ আমি যখন জেলে যাই প্রথমবার তখন আমার বয়স আটাইশ।

বিয়ে করার বয়স।

এক্কেরে পরিপূর্ণ বয়স। তখনকার দিনে পঁচিশ থেকে আটাইশই ছিল পরিপক্ক বয়স। আইজকালকার যে তিরিশ থিকা পয়ত্রিশ বত্রিশ হইছে, আগে তো আটাইশ যথেষ্ট। তো আমার আটাশ হইছিল, জেলখানার সময়। তো আমার সঙ্গে যাগো সম্পর্ক হইছিল তারা তো নানা রকম মহিলা। একজন কি দুইজন ছাড়া সবাই সেই বছরই ইউনিভার্সিটি পাশ কইরা বাইরাইয়া গেল।

এইটা কত সালের ঘটনা?

এইটা হইল ফিফটি এইটে।

কয় বছর জেলখানায় ছিলেন?

চাইর বছর।

কী কারণে?

ধইরা নিয়া গেছে। কম্যুনিস্ট। বইলা দিল তারা আর কি। আমার তো কিছু কওয়ার নাই। তারা মনে করল এইটা।

আপনি কম্যুনিস্ট ছিলেন না?

আমি তো কম্যুনিস্ট ছিলামই। কিন্তু তারা মনে করল আমি কম্যুনিস্ট-সাংঘাতিক বিপজ্জনক কম্যুনিস্ট। আসলে আমি বিপজ্জনক কম্যুনিস্ট ছিলাম না। আমি পড়াশোনা এইটা-ওইটা, ডেনজারাস কাজ আমাকে দিয়ে কিছু হয় নাই তা না। কিন্তু আমি ওই রকম ডেনজারাস ছিলাম না, যেইটা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তাইলে জেলখানায় ঢোকার আগে মেয়েদের সাথে আপনার একটা সম্পর্ক ছিল?

হ্যাঁ, তাতো থাকবেই। সবারই থাকবে। মেয়েদের সাথে সম্পর্ক, মেয়েদের পিছনে ঘোরা এইটা আমার আরম্ভ হইছে যখন আমার বয়স ষোল কি সতের।

মানে আপনি যে সাত্ত্বিক পুরুষ তা না?

না। আচ্ছা সাত্ত্বিক পুরুষ কারে কও তোমরা?

যে কোনো মেয়ের দিকে তাকায়ই নাই।

দুরো মিয়া, মানুষ নাকি সে! সাত্ত্বিক বইলা কোনো জিনিস নাই তো। কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় নাই, মিছা কতা কয়। ঢাহা মিছা কতা কয়।

তার মানে মেয়েদের সঙ্গে সংসর্গও ঘটছে আপনার?

না, সংসর্গ বলতে তুমি কতদূর মনে করো?

মানে যৌন সম্পর্ক হইছে কিনা?

না। কোনো সম্পর্ক হয় নাই। আমার মেয়েদের সাথে সম্পর্ক ছিল অনেক। সেই মেয়েরাই পরবর্তীকালে, ক্রমান্বয়ে, আস্তে আস্তে দুয়েকজন ক্লোজার হইছে। জেলখানায় চইলা গেছি। চাইর বছর পরে এই মেয়েগুলাই কলেজ থিকা ভার্সিটি থিকা, বাইর হইয়া তারা কি আমার জন্যে বইসা থাকতে পারে!

পরবর্তী জীবনেও তো মেয়েদের সঙ্গে আপনের সম্পর্ক হইছে, নাকি?

হ্যাঁ, ছিল। মেয়ে বা মহিলা। মেয়ে এবং মহিলা দুই রকম।

ব্যাখ্যা করেন।

মেয়ে বলতে সাধারণভাবে যাদের ব্যাখ্যা করা হয় সেটি হচ্ছে, সে মেয়েটির বিবাহ হয় নাই। এবং উপযুক্ত হইয়া উঠতে আছে। এবং বারো-চৌদ্দ বছর হইয়া গেছে। তারপর কৈশোর পার হইয়া সে যৌবনে গেছে। এবং উনিশ-কুড়ি পার হইয়া গেছে। এই রকম এরা মেয়ে। আর মহিলা হচ্ছে যারা ষোল বছরে হউক, আঠারো বছরে হউক, বাইশ বছরে হউক, বিশ বছরে হউক তার বিয়াশাদী হইছে। দে আর কল্ড উওম্যান।

এইটা আপনে গাজী শামছুর রহমানের মত কইরা বললেন। উনি এইভাবে কথা কইতেন। মানে সংজ্ঞা নির্ধারণ কইরা নিতেন।

কোন শামছুর রহমান।

বিচারপতি শামছুর রহমান।

ও-ও-ও আছিল। তো সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হইব না? সংজ্ঞা নির্ধারণ তো অনেক রকম আছে। আমি, দাঁড়াও তোমাকে…আমি গেছিলাম, কুড়িগ্রামের বুড়িমারী। লংমার্চে। তো আমাকে এরা ধরে-টরে নিয়ে গেছে। ডাক্তার জামান-টামান এরা। দুই বছর আগে। খুব ঘুরাঘারি। এর আগে তো মওলানা ভাসানীর সাথে আমি রাজশাহী গেছি লংমার্চে।

ছিয়াত্তরে না?

হ। তারপরে এই লংমার্চটাও হইল একটা। তখন আমাকে ধরল যে আপনার যাইতে হবে। কয় যে চলেন, মানুষ উপকৃত হবে। নিউইয়র্ক থেকে লোক আইছে। আমি বললাম যে আমাকে রক্ষা কইরা যদি নিয়া যাইতে পারো তো চলো। তো তারা আমাকে রক্ষা কইরা আইনা বাইত্তে পৌঁছায়া দিছে এক দিন পরে। তারপরে গেছি বহু দূর। এক্কেরে সীমান্ত তো। ব্রহ্মপুত্রের সীমান্ত। মাঝখানে ব্রহ্মপুত্র। সেই ব্রহ্মপুত্রের চরে মিটিংটা করছে। তো আমরা যে মিটিংটা করছি এইটা অদ্ভুত। আমরা বোঁচকাবাচকি রাইখা রেস্টহাউসে যখন গেলাম তখন দেখি নদীর মাঝখানে একটা চর পইড়া রইছে, বিরাট চর। তো চরের উপরেই মিটিং করছে। সেখানে বাড়িঘর নাই। এক্কেরে ধুলাবালি দিয়া চর। নিউ ইয়র্ক কমিটি ঢাকায় আইছিল। ডক্টর জামান-টামান এরা ছিল।

১৯৭৩ সালে মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বঙ্গবার্তা’র প্রধান সম্পাদক ফয়েজ আহ্‌মদ , টেপ রেকর্ডার ধরে আছেন বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানী। ছবি: অজানা

১৯৭৩ সালে মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বঙ্গবার্তা’র প্রধান সম্পাদক ফয়েজ আহ্‌মদ , টেপ রেকর্ডার ধরে আছেন বার্তা সম্পাদক কামাল লোহানী। ছবি: অজানা

ডক্টর জামান কে?

ডক্টর জামান হইল কমিউনিটি হাসপাতালের হেড এইখানে।

কামরুজ্জামান।

হ, কামরুজ্জামান। নিউ ইয়র্ক থিকা আসছিল দুইজন। একজন হইল টিপু সুলতান। ওইখানে সে প্রচুর রুজি করে আর এই সমস্ত কমিটি-টমিটিতে প্রচুর কাজ করে। ও হচ্ছে নিজে ফার্মাসিস্ট। সে এমএ পাশ করছে ফার্মা নিয়া। তার বউও করছে তাই। তারা ওইখানে বাড়িঘর কইরা এখন ঘণ্টায় পায় তিরিশ ডলার।

কোন জায়গায় বাড়ি করছে?

নিউ ইয়র্কে বাড়ি করছে, ঢাকায় বাড়ি করছে, গ্রামে বাড়ি করছে।

এখন ঘণ্টায় তিরিশ ডলার কীসে থিকা পায়?

সে কাজ করলে পায়, না করলে পায় না। এইটা হইল মিনিমাম। এখন বোধহয় বাড়ছে। পাঁচ বছর আগের কথা আমি কইতাছি। ঘণ্টায় তিরিশ ডলার…

নিউ ইয়র্কে কাজ করলেই তিরিশ ডলার পায় ঘণ্টায়।

না। যদি ফার্মাসিস্ট হয়। সবাই এই জিনিস পায় তা না। তার বউও এই দেশে ফার্মাসিস্ট হইয়া পরে গেল। দুইজনে মিলা এহন তিরিশ তিরিশ কইরা ষাইট ডলার ঘণ্টায়। এহন দুইজনে যদি চাইর ঘণ্টা কইরা কাজ করে চাইর তিরিশে…সোয়া শ ডলার ধরো। সোয়া শ ডলার কইরা এহেক জনে রুজি করে। তো তহন কয়ডা বাড়ি হয়?

বহুত বাড়ি, বাড়ির তো শেষ নাই।

তাও একটা বাড়ি করছে বি-রা-ট বাড়ি।

আমেরিকায়?

হ, তার দুইটা মেয়ে। সে পড়াইছে। গত বছর দুইটা মেয়ে পাশ করছে, হায়ার ডিগ্রি নিছে, দুইটাই ফার্স্ট ক্লাস পাইছে।

না, এইটা কইলেন কেন? এই ঘটনাটা কেন বলতেছেন? আপনে তো বুড়িমারীর কথা বলতে নিছিলেন।

বুড়িমারীতে টিপুই হচ্ছে মেইন ম্যান।

হ্যাঁ, তার সঙ্গে আপনে গেলেন দুই বৎসর আগে।

লইয়া গেল আমাকে। তো অরা আমাকে ভালোবাসে খুব। কয় যে আপনাকে যেতে হবে। লইয়া গেল। আমিও যাইয়া-টাইয়া আইলাম। যখন আমি…যেই কথা বলতে চাই হেই কিন্তু অনেক দূরে। যখন আমি…আমার লগে গল্প করতে আইছো.. টেরই পাইবা…যখন আমি কনফারেন্সের পরে বিকাল বেলা চাইরটার দিকে চরের থিকা ফিরা গেস্ট হাউসে আসি বুড়িমারীতে…না চিলমারী বলে…না কী জানি বলে…ওই চরের অঞ্চলটার অন্য মারী আছে একটা নাম। বুড়িমারী অইল সাবডিভিশন।

আদিতমারী নাকি?

না, আছে আর কি। নাম আছে। নামকরা। তো আমরা যখন আসলাম…আসার পরে আমরা যখন খাইয়া-দাইয়া এক ঘণ্টা পরে ঢাকার দিকে রওনা দেব দেখা গেল আমাগো লগে একটা ছেলে। আমার তো প্রশ্ন করার অভ্যাস সারাজীবনের। সেই অভ্যাস হইছে রিপোর্টিং থিকা। এখনো পুরাপুরি যায় নাই। থাকে, কতগুলি জিনিস থাইকা যায়। যেমন ধরো কোথাও গেলে খালি এনকোয়ারি করি। যেগুলি জানি না। আমি সেই ছেলেকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাড়ি কোথায়। বলে এই দিকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের এইখানে মঙ্গা হয়? কেন তুমি দেখতেছি দিব্যি ভালোই আছো। তোমগো এদিকে তো ধান দেখতেছি ক্ষেতভরা, সবুজ। এর মধ্যে মঙ্গা হয় কেমনে? কেমনে তিনমাস তোমরা কষ্ট করো? এইভাবে কোশ্চেন আইসা পড়ে। আমার মনের মধ্যে এগুলি ছিল। তো আস্তে আস্তে তারে কইলাম, এই দেশে মানুষ কী রকম? কৃষকরা কী করে। কয় কৃষকদের ছেলেমেয়ে আছে, কারো বাড়িটুকু আছে। আর একটাও ধানী খামার তাদের না। এই যে আপনেরা দেখতেছেন হাজার হাজার খামার, একটাও তার না। কৃষকদের না। কার? বলে, মহাজনদের। ভূস্বামীদের। কারো পঞ্চাশ বিঘা, কারো একশ বিঘা, কারো পাঁচশ বিঘা, কারো দশ বিঘা আছে। শীত আসলেই টাকাটা ধারটা উঠাইয়া বাকিটা বিক্রি কইরা দেয়। নিজেরা কাচারিতে থাকে আরাম কইরা। অথবা ইলেকশন করে। ওরা ঢাকায় আইসা যখন ফুর্তি করে আর গুলশানে বড় দোকানে খায় যখন পোলাপাইনে তখন কৃষকরা ওইখানে মঙ্গায় মারা যায়। এই হইল খবরটা। এখন আমি কইলাম, লোকগুলি কী রকম তোমাদের দেশের যে তারা এই প্রতিরোধ আর করে না। আজকা পঞ্চাশ বছর যাবৎ এই-ই শুনতেছি-মঙ্গা! মঙ্গা! এই ছেলে। ছেলে চটপটে ছেলে, ওইজন্যই জিগ্যেস করছিলাম। তো কয় যে আমাদের দেশে অনেকগুলি ভাগ আছে। এই জমি যেমন আমাদের একটাও না। আমি থাকি চরের ছাপড়ায়। ধান বানবো-টানবো, দিয়া আসবো, কিছু পাবো। খাইয়া-টাইয়া নয় মাস চলে। আর তিন মাস চলে না।

ওই তিন মাসই মঙ্গাটা হয়।

মঙ্গাটা হয়। এবং অরা সব ঢাকায় পইড়া থাকে, মালিকরা। তারা আর আসে না। আবার বোনার সময় আসে। তখন না বুইনা পারি না আমরা। করুমটা কী। ‘ছেলেমেয়েগুলি কী করে তখন?’ কয় যে ছেলেমেয়েদের বিভিন্ন রকম ক্লাসিফিকেশন আছে। সে কইল, কইতে কইতে এক জায়গায় আইসা কয় যে আমাদের এইখানে মহিলা আর মেয়ে আছে। কইলো। ‘মহিলা আর মেয়েটা কী?’ কয় কি যে মহিলা হচ্ছে যাদের বিয়া হইয়া গেছে। আর যাদের বিয়া হয় নাই তারা হচ্ছে মেয়ে। ব্যাস। ‘তো বিয়া হয় কবে?’ এই বারো থিকা চইদ্দ। চইদ্দ বছরে বিয়া হইয়া যায়। বিয়া বইতে বাইধ্য হয়। না বইলে লইয়া যাইব গা মাইয়ারে।

কে নিয়া যাবে?

আরেকজন, পাশের বাড়ির। মেয়েটাকে নিয়া যাবে তো, দুই তিনজনে মিলা আইসা। এ এক সমস্যা। যার জন্য সবাই মেয়েকে বিয়া দিয়া দেয়। বারোতে কথাবার্তা কয়, চৌদ্দতে বিয়া দিয়া দেয়। ম্যাক্সিমাম। তো ওই বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে মেয়েরা হচ্ছে মহিলা আর যাদের বিয়া তখনো হয় নাই তারা মেয়ে। আমি কই, তোমগো এইখানে মহিলা বেশি না মেয়ে বেশি? কয় মহিলা বেশি। তো মেয়েদের মইধ্যে দুইটা ভাগ, হাঃ হাঃ হাঃ। ওইখান থিকা আমি এইটা পাইছি। তো এই একটা নলেজ আর কি।

তো, জিনিসটা হইতেছে, আপনে জেলখানা থিকা বের হইয়া আর মেয়েদের সঙ্গে সংসর্গ মানে সম্পর্ক করেন নাই?

করছি।

প্রেম ছিল?

না, প্রেম না। তোমরা প্রেম কাকে কাকে বলো আমি জানি না। তোমরা কথা বললেই ‘প্রেম’ বলো। এইটা হচ্ছে ভাষাগত দিক আর কি। আসলে এটা কী, বলা বড় মুশকিল।

এটা নাকি কেউই নাকি বলতে পারে না প্রেম কী জিনিস। অথচ সবাই নাকি করে।

করে।

আপনে সেই রকম কিছু করেন নাই।

না, আমার তো আছিলই। এই তো মাস ছয়েক আগে আমার এক বান্ধবী মারা গেল। সে মারা গেল একলা একলা থাকতে থাকতে…

সেও একলা থাকত?

হ, তার আর বিয়া হয় নাই। সে ছিল বনানীতে তার বাড়িতে। একটা দোতলা বাড়িতে। আমার লগে আলোচনা করছিল বাড়িটা কী করব। ভাড়া দিব কিনা। খাওয়া-দাওয়া করত নিচতলায়। আর ওপর তলায় থাকত দুইটা রুমে। একা। এবং তার খুব জিদ। তো বিভিন্ন ধরনের ক্যারেক্টারের মেয়েকে আমি চিনি আর কি। এ একটা জিনিস। সে কারো লগে কোনো গণ্ডগোল করব না। যাকে সে ডাকবে না, ডাকবে না। যাকে ডাকার সে ডাকবে। এ এক অদ্ভুত। কাউরে কইল যাইতে, আইজকা বিকাল বেলা পাঁচটার সময় আসবেন। যদি সে ডাকে, যাইতে হবে।

আপনি গেছিলেন পাঁচটার সময়?

আমি গেছি বহুবার। হে যখন আমারে অর্ডার দিত আমি গেছি। তা না হইলে একটা ভীষণ তুলকালাম কাণ্ড করবে। এই বয়সেও। তার তো বয়স তখন ষাইট হইয়া গেছে গা।

যখন মারা গেছে?

হ। রিটায়ার করল তো সে। কলেজে পড়াইত। সে মারা গেল। তাও সে রইছে একা। দোতলায় থাকত। একটা চাকর ছিল, একটা গার্ডেনার ছিল, একটা ড্রাইভার ছিল। তিনটা। সে ভাইবোনদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখত না। ভাইবোন যদি তার সঙ্গে না রাখত, সে রাখত না।

তার সঙ্গে আপনের সম্পর্ক কত দিনের?

যাহ। সেই সম্পর্ক তো আমার এই রকম অনেক কয়েকজন আছে। এই হিসাবে সম্পর্ক ফিফটি ফাইভ থিকা।

তাইলে মানুষ যে আপনেরে চিরকুমার ভাবে?

আমি তো চিরকুমারই।

তো আপনের সঙ্গে তো মেয়েদের সম্পর্ক আছেই।

মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকাতে কি কৌমার্যের ক্ষতি হয়?

আপনের কি কৌমার্যের ক্ষতি হয় নাই। আপনের কি কারো সঙ্গে কোনো যৌন সংসর্গ ঘটে নাই। এইটা আপনি বলতে পারেন?

নাহ।

আগ্রহ হয় নাই কখনো।

আগ্রহ তো অন্য জিনিস। তোমরা তো ভুল বুঝতাছো। তোমাদের এই এক্সপিরিয়েন্স নাই বইলা…তোমাদের এই এক্সপিরিয়েন্স নাই যে একটা মেয়ে তোমাদের সঙ্গে আছে… তোমার সাথে আড্ডা দেয়, তোমার বাড়িতে আসে বা তুমি যাও, বা দুই মাসে দেখা হয়, একমাসে দেখা হয়, সেই মেয়েটার সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্ক হইতাছে বা হইতাছে না এইটা সম্পর্কে তোমার জ্ঞান কম। বোঝো নাই তোমরা। সাধারণ পুরুষ হিসাবে একটা বা দুইটা বা তিনটা বা চারটা মেয়ের প্রতি আগ্রহ বোধ করছো ঠিক আছে। আপত্তি নাই তো কোনো। চলো তুমি ইউনিভার্সিটির মেয়েদের সঙ্গে কিন্তু প্রাইভেটলি তার কাছে দুর্বল, এইটা হইতে পারে তো? সে মেয়েটি লেখাপড়া কম করছে বা আইএ বিএ পাশ করছে বা মেট্রিক পাশ করছে, তার বাপ-মা চেষ্টা করতেছে বিয়া দেওনের জন্যে। তোমার লগে হইতেছে না, কিন্তু চেষ্টা করতেছে বিয়া দেওনের জন্যে। তুমি যাওয়া-আসা করো। ক্ষতি কী? ক্ষতি নাই তো কিছু। এই রকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে যে থাকে আর যে সিদ্ধান্তই নেয় বিয়ের ব্যাপারটা আসতেছেই না প্রশ্নের মধ্যে…কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে আমি মিশছি এইভাবে। তো সেই মেয়েটার কী হইল জানো?

সেই মেয়েটা হঠাৎ সকালবেলা একদিনকা নিউজপেপারে দেখি সে গতকাল রাত্রে মারা গেছে। ট্রাজেডি হচ্ছে, সে তার নিজের বাসায় ছিল। একটা ড্রাইভার, সে প্রায়ই তাড়ায় দেয়, বুড়াকালে মেয়েদের তো হইতে পারেই খারাপ ব্যবহার…আরেকটা ইয়াং ছেলে, সেই ছেলেকে বলছে তুমি আমারে একটা গার্ডেনার আইনা দেও, বাগান করার লোক। লোক গেছে গা। তো আনছে। আনছে পরে সে এইবার আনছে একটা সন্ত্রাসীরে।

সন্ত্রাসীরে?

সন্ত্রাসীরে ভাড়া পাওয়া যায় তো। তো আনার পরে বেগম সাহেবার লগে সকাল বেলা দিনের বেলা একবার দেখা হয়, ইন্সট্রাকশন দেয় আবার সন্ধ্যার সময় বোঝায় দিয়া চইলা যায়। গেটের কাছে আইসা। এই তার কাজ। তারে হয়তো পাঁচ শ টাকা বা তিন শ টাকা দেয়। খেয়াল কইরো। ওই ড্রাইভারটা বদমায়েশী কইরা তাকে ডাকাতি করানোর জন্যে ওই সন্ত্রাসীটাকে আনছে। আনার দুই দিন পরেই সন্ধ্যার সময় ওনার সঙ্গে দেহা করছে, মাইজী এই রকম আছে, এই রকম আছে, কইয়া চট কইরা থাবা দিয়া ধরছে দোতলায়। ধইরা তারে মুখ বন্ধ কইরা দিছে। তারে গলায় ফাঁস দিয়া, তার কাপড় দিয়াই, মাইরা ড্রয়ারে-ট্রয়ারে যা ছিল সোনার অলঙ্কার, টাকা-পয়সা কিছু ছিল এগুলি সব নিয়া তাকে দোতলার রুমে রাইখা ফিফটিন মিনিটস-এ চইলা গেছে। তার পাওয়া যায় নাই খবর। পুলিশে কেইস হইছে, পরবর্তী কালে ভাইরা করছে। তাতে কোনো লাভ হয় নাই। এই যে এই মহিলা, এই মহিলা আমার খুবই ক্লোজ ছিল। তারও চয়েস ছিল, ইচ্ছা ছিল, আকাক্সক্ষা ছিল। তার হাজবেন্ড কী রকম হবে, তার একটা ধারণা ছিল তার। এগুলি হয় নাই আর।

১০/১২/২০০৬

লিংক: আর্টস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Flag Counter

j j j

আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার (১৯৯৫)

sofa55

“আওয়ামী লীগ থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ভিন্ন রকম রাজনীতি সৃষ্টি করার চেষ্টা আমরা করেছি–করতে পারি নি।” – আহমদ ছফা

সাক্ষাৎকার: ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু: বর্তমান যে রাজনৈতিক অবস্থা, আপনারা যারা লেখক-বুদ্ধিজীবী আছেন, আপনাদের করণীয় কী?

আহমদ ছফা: বুদ্ধিজীবীদের কথা আমি বলতে পারবো না, আমি আমার কথা বলি। একটা বিষয় নিশ্চিত যে, আমাদের জনগণ আগের চাইতে অনেক সচেতন হয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে এ ধরনের ডেডলক তৈরি হলে রাস্তায় রাস্তায় পাঁচ হাজার বঙ্গবন্ধুর শহীদের লাশ পেয়ে যেতাম, পাঁচ হাজার শহীদ জিয়ার সৈনিকের লাশ পেয়ে যেতাম। এখন রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল করছে কিন্তু মানুষকে টানতে পারছে না। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সীমাবদ্ধতা বোঝে। কিন্তু দেশে তো একটা রাজনীতি দরকার। এখন রাজনীতিক প্রক্রিয়াটাই একটা অচল অবস্থার মধ্যে এসে গেছে। স্বামী-স্ত্রী দু’জন থাকে, তারা ঝগড়াও করে, এটা স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে যখন কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, একজন আরেকজনের প্রতি উদাসীন হয়ে যায় সেটা হচ্ছে একটা অ্যালার্মিং ব্যাপার।

রাইসু: রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও কি তাই নাকি?

ছফা: এটা তো রাজতন্ত্র না। সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বলার অধিকার আছে। তাদের ভোটে দাঁড়াবার অধিকার আছে। দেশ চালাবারও অধিকার আছে। এখন যে সরকার আছে সে সরকারটি তো চিরন্তন কোনো ব্যাপার না। যখন লোকে চাইবে না, তাদের চলে যেতে হবে। এবং তাদের প্রতি ভবিষ্যতে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের একটা শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। তারা যদি মাইনরিটিও হয়। কারণ শ্রদ্ধা এবং আস্থাবোধ–এটি হচ্ছে গণতন্ত্রের অক্সিজেন। আমি ক্ষমতা চালাচ্ছি বটে কিন্তু যে বাইরে আছে তার মতামতের মূল্য আমি দেবো। যেহেতু ওদের না দিয়ে জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে, আমার মতামতের মূল্য দিয়েছে। অথচ সরকারও বুঝতে রাজি না অন্যের মতামতের মূল্য দেবে কেন। Read More

j j j

নিজের লেখা সম্পর্কে আমার অহংকার অনেক বেশি — হুমায়ূন আহমেদ, ১৯৯৪

সাক্ষাৎকার: সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু

humayun33
হুমায়ূন আহমেদ: কী বলবো?

ব্রাত্য রাইসু: কিছু একটা বলুন।

হুমায়ূন: কোন প্রসঙ্গে?

সাজ্জাদ শরিফ: আপনার ফিল্ম প্রসঙ্গেই বলুন।

হুমায়ূন: অনেকদিন থেকেই ছবি তৈরি করার একটা শখ ছিল আমার। আমাদের দেশে এত বড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল, এতগুলো মানুষ মারা গেল, স্বাধীন একটা দেশ হল, কেউ একটা ভালো ছবি বানাতে পারল না। এটি আমাকে সবসময় অসম্ভব রকম কষ্ট দিত। এরশাদ সরকার যখন ছবি তৈরির কথা ভাবলেন, তখন আমি ছবির স্ক্রিপ্ট তাদেরকে দিতে চাইলাম, আমার মুক্তিযুদ্ধের একটি উপন্যাস–১৯৭১-এর। তারা সে ছবিটি করতে রাজি হলেন না। বাংলাদেশ সরকার চাচ্ছিলেন এমন একটি ছবি যেখানে এই মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারগুলো থাকবে না। এখানে অনেক বিতর্কিত ব্যাপার আছে যেগুলো নিয়ে ছবি করার সাহস সম্ভবত সে সরকার অর্জন করতে পারেন নি। যে কারণে আমাকে শঙ্খনীল কারাগার-এর স্ক্রিপ্ট দিতে হল। এ ছবিটি বানাতে অনেক টাকা পয়সা লাগে। সে টাকা পয়সার জন্য অনেক ধনী ব্যক্তির কাছে হাত পেতেছি। আমি একা না, আমি তো ধনী মানুষদের বেশি চিনি না। ধনী মানুষদের চেনে আসাদুজ্জামান নূর। নূরকে সঙ্গে নিয়ে আমি এদেশের অনেক ধনী লোকের কাছে গিয়েছি। কেউ টাকা-পয়সা দিতে রাজি হয়নি। কিন্তু আমি স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি প্রায় তিন বছর হল। আমি কোন ফিল্মমেকার না। গাদাগাদি ছবি তৈরি করবো না। আমি একটিই ছবি বানাবো। মুক্তিযুদ্ধের ছবি। এক পর্যায়ে আমি একটি মিটিং করে আমার প্রকাশকদেরকে বললাম আমার স্বপ্নের কথা। তাদের সাহায্য চাইলাম। আমার বিশজন প্রকাশক আছে। তাদেরকে বললাম, আপনারা ছবির প্রযোজক হয়ে যান। ২ লাখ টাকা করে আমাকে দেন। তারা বলল, হ্যাঁ ঠিক আছে। এই প্রথম ভরসা পেলাম যে, না, ছবিটা আমি করতে পারব। টাকার অভাবে আমি আটকে থাকব না।

সাজ্জাদ: আপনি তো প্রথমে ১৯৭১ নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন, পড়ে তাহলে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আগুনের পরশমণি নিয়ে করার কারণটা কী?

হুমায়ূন: এর কারণটা আগুনের পরশমণি-র পুরো ব্যাপার একটা ঘরের ভেতরে ঘটে। এতে আমার টাকা-পয়সা অনেক কম লাগবে ছবিটি বানাতে। ১৯৭১-এর যে বিশাল পটভূমি তাতে আমার জন্য জিনিসটা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এবং অনেক জটিলও হয়ে যাবে।

সাজ্জাদ: এবং একটা মিষ্টি প্রেমের ব্যাপারও আছে এতে, তাই না?

হুমায়ূন: আগুনের পরশমণি মূলত একটি প্রেমের উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধটা সেখানে পটভূমি হিসেবে কাজ করছে।

রাইসু: আপনার কি মনে হয় যদি ১৯৭১ নিয়ে ছবি করতেন তাহলে দর্শক একটু কম পেতেন ।

হুমায়ূন: দর্শক বেশি পেতাম কি কম পেতাম এটা কিন্তু আমার মাথার মধ্যে ছিল না। আমার মাথায় ছিল কোনটাতে টাকা কম লাগবে। আমার প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে অর্থ। কোন ফিল্মমেকার যদি তার পুরো ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান তাহলে আসলে তার উচিত ১৯৭১ নিয়েই ছবি করা। আর আমার অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা তো একটা রয়েই গেছে।

রাইসু: বড়ো পর্দায় আপনার ভীতি কী কী?

হুমায়ূন: বড়ো পর্দায় আমার ভীতি তেমন কিছু নেই। আমি মানুষটা ছোটখাটো হলেও আমার সাহসের অভাব কোনকালেই ছিল না। টেলিভিশন কিছুই না, আসল জিনিস হচ্ছে বড়ো পর্দা। ভীতির কথাবার্তা অনেকে বলেন, আমি তার কোনরকম কারণ দেখি না। দুটোই ক্লোজআপ মিডিয়া। বড়ো পর্দার ডেপথ অফ ফিল্ড অনেক বেশি। এ ব্যাপারটি ছোট পর্দায় নেই। বড়ো পর্দাটা ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে কাজ করে। টেলিভিশন ক্যামেরা ঘোরে ১৮০ ডিগ্রিতে।

রাইসু: আপনার নাটক থেকে ছবিটাকে আলাদা করবেন কীভাবে?

হুমায়ূন: নাটক থেকে ফিল্মকে আলাদা করার কোন প্রয়োজন দেখি না। আসলে তো এটা একটা শিল্পমাধ্যম। ‘খাদক’ নামে আমি একটি গল্প লিখলাম। এই গল্পকে আমি ট্রান্সফার করলাম টেলিভিশন পর্দায়। এই গল্পকেই আমি নিয়ে এলাম বড়ো পর্দায়। এই নিয়ে আসার ব্যাপারটি ঘটে যাচ্ছে সেখানে। এছাড়া বাকি যেগুলো সেগুলো তো টেকনিক্যাল ব্যাপার।

সাজ্জাদ: কিন্তু আপনি যখন লিখছেন তখন কাজ করছেন ভাষা নিয়ে, যখন আপনি টিভিতে যাচ্ছেন আপনার চোখটা তখন অংশগ্রহণ করছে।

হুমায়ূন: লেখার ব্যাপারে একটা সুবিধা হল কী, আমি যখন লিখি, যাদেরকে নিয়ে লিখছি ওদেরকে আমি দেখাচ্ছি না। পাঠক একটা সুবিধা পাচ্ছে, সে নিজের মতো করে ওদের কল্পনা করতে পারছে। কিন্তু যখন ওদেরকে আমি পর্দায় দেখাচ্ছি তখন পাঠককে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। আমি যেরকম জিনিসটাকে উপস্থিত করেছি পাঠককে সেরকমই দেখতে হবে। এর বাইরে সে যেতে পারছে না।

সাজ্জাদ: আপনার মিসির আলীকে নাটকে নিয়ে আসা উচিত হয় নি সেক্ষেত্রে। আপনি তাকে খুন করেছেন।

হুমায়ূন: হ্যাঁ। মিসির আলীকে নাটকে নিয়ে আসা একটা সমস্যার তৈরি করেছে। এটা মিসির আলী না হয়ে প্রফেসর শঙ্কু হয়ে গিয়েছে।

সাজ্জাদ: লিখতে লিখতে হঠাৎ করে আপনার অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়ার প্রতি আগ্রহটা জন্ম নিল কেন?

হুমায়ূন: ৭১/৭২ সালের কথা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময়কার ছাত্র। সেসময় আনিস সাবেত ছিল আমার বন্ধু।

সাজ্জাদ: আপনারা তো পরিকল্পনা করেছিলেন যে বিয়ে করবেন না।

হুমায়ূন: আমি, আনিস সাবেত এবং আহমদ ছফা আমাদের তিনজনের একটা পরিকল্পনা ছিল যে আমরা বিয়ে-টিয়ে কিছুই করবো না। আমরা সাহিত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করবো। এদের মধ্যে আমি বিয়ে করে ফেলেছি।

রাইসু: আর একজন বিয়ে করার সুযোগ পাননি।

হুমায়ূন: আর একজন মারা গেলেন বিয়ে করার আগেই, আনিস সাবেত। ছফা ভাই এখনো করেন নি। অবশ্য আনিস সাবেত বিয়ের বয়স পার করেই মারা গেছেন। আনিস সাবেতের ছবির প্রতি অসম্ভব আকর্ষণ ছিল। সেসময়ে ছবির শর্ট কোর্স দেওয়া হত, সেগুলো তিনি সব নিতেন। আমার কাছে টাকা-পয়সা ছিল না। সে সমস্ত কোর্স নেওয়ার সঙ্গতি আমার ছিল না। উনার আমার চেয়ে বেশি টাকা-পয়সা ছিল, উনি টাকা-পয়সা দিয়ে ঐ কোর্সগুলি নিতেন। বইপত্র আনতেন। কোর্সের সময় অনেক রকম জিনিসপত্র সাপ্লাই করতো সেগুলি তিনি নিয়ে আসতেন। যেহেতু আমরা পাশাপাশি রুমে থাকি সেজন্যে রাত ৯টা বা ১০টার পরে বসে বসে সব আলাপ আলোচনা করতাম। আমরা ঠিক করতাম কীভাবে ছবি বানাবো। এই ছিল আমাদের সেই প্রথম যৌবনের কল্পনা। আনিস সাবেত যখন বিদেশে, কানাডায়, ছবি বানালেন একটা। আমাদের যে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলেন। তিনি একটি শর্ট ফিল্ম বানালেন। ফিল্মটির নাম হচ্ছে মন মোর মেঘের সঙ্গী। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানটি তিনি পিকচারাইজশন করলেন। সেটি জার্মানির ফিল্ম ফেস্টিভালে অনারেবল মেনশন পেলো। কাজেই আনিস সাবেত তার কথা রাখলেন। আর এই মিডিয়ার প্রতি আমার আগ্রহের কারণ হল আমি দীর্ঘদিন টেলিভিশন নিয়ে কাজ করেছি। ওখানে দেখেছি অনেক সমস্যা আছে, অনেক মজার ব্যাপারও আছে ।

সাজ্জাদ: আপনি নাকি রাগারাগি করেন নাটক করার সময়?

হুমায়ূন: না, রাগারাগি না–আমার বদনাম আছে যে, আমি ‘খুব’ রাগারাগি করি। আসলে আমি খুব সফট…

সাজ্জাদ: কোথাও হেঁটে যাচ্ছেন বা বসে আছেন তখন ভক্তদের নিয়ে নানারকম ঝুটঝামেলা নিশ্চয়ই হয়। মাঝে মাঝে নিশ্চয়ই বিরক্তিও লাগে। তখন আপনার রাগ হয় না, উল্টাপাল্টা কিছু করেন না?

হুমায়ূন: রাগ আসে। রাগ আসলে রাগটা চেপে রাখতে হবে এ কথা মনে থাকে না আমার। রাগ আসলে রাগটা চেপে রেখে একটা ভালো কিছু করতে হবে, আমার এ কথা মনে হয় না। আমি অবশ্যই রাগ করি।

রাইসু: কীভাবে?

হুমায়ূন: চিল্লাচিল্লি, হৈ-চৈ করি। একটা ঘটনা বলি। আমরা টেকনাফ থেকে ফিরছি মাইক্রোবাসে। বাসটি প্রায় ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে যাচ্ছে। আমাদের সামনে সামনে যাচ্ছে একটা পাজেরো। পাজেরো গাড়ি তো খুব দ্রুত স্পিড নিতে পারে, তো আমাদের চেয়ে বেশি স্পিডেই যাচ্ছে। আমরা নিরাপদ দূরত্ব রেখেই যাচ্ছি। হঠাৎ করে পাজেরো জিপটি রাস্তার মাঝখানে ব্রেক করে থেমে গেলো। আমার ড্রাইভারের নিজের গাড়িটিকে থামাতে অসম্ভব রকম বেগ পেতে হল। যেহেতু সে ছিল খুবই এক্সপার্ট একজন ড্রাইভার, সেহেতু গাড়িটা বাঁচাতে পারল। পাজেরো জিপের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করা হল সে এরকম করলো কেন। সে বলল, যা করছি, ঠিক করছি। আসল কারণ হচ্ছে ঐ গাড়িটায় এক জাপানি ভদ্রলোক যাচ্ছিল। বড়ো কর্তাব্যক্তি একজন। সেই জাপানী কর্তা ব্যাক্তি রাস্তায় দেখতে পেয়েছে তার পরিচিত লোক, ড্রাইভারকে সে গাড়ি থামাতে বলেছে। আর ড্রাইভারের হয়েছে কি, এত্ত বড়ো একজন লোককে সে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে- একটা মাইক্রোবাসের একজন লোককে তার পাত্তা দেওয়ার কি আছে! তো ড্রাইভার তখন উল্টাপাল্টা কথা বলছে। আমার সঙ্গে যারা ছিলেন তারা চাচ্ছেন ঝামেলাটা চলে যাক। আমি অনেক্ষন চুপ করে রয়েছি। হঠাৎ মনে হল, না এটা তো হতে দেওয়া যায় না। কী হয়েছে আরোহী জাপানী বলে। আমি গাড়ি থেকে নেমে আসলাম। তখন কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা। টেকনাফে জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নামার সময় কোমরে ব্যথা পেয়েছি। আমি বাঁকা হয়ে নেমে আসছি। হঠাৎ জাপানি দেখল, বাঁকা একটা লোক গাড়ি থেকে নেমে আসছে আমি তাকে বললাম, এই ড্রাইভারটিকে আমরা থানায় নিয়ে যাবো। এই বদ ড্রাইভারকে। জাপানি ভদ্রলোক আমাকে বলার চেষ্টা করলেন, আমার তো কোন দোষ নেই। শুরুতে পাত্তাই দিলেন না জাপানি ভদ্রলোক। তারপর আমি তাকে কঠিনভাবে বললাম, জানেন, মস্তবড় মেজর এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিলো? এ লোকটি সেটি উপেক্ষা করেছে। সে দেখেছে যে এতো স্পিডে একটি গাড়ি আসছে, তারপরও সে অশালীন ব্যবহার করছে। আমি একে ছাড়ব না। আমি একে ধরে নিয়ে যাবো থানায়। এই সময় একদল ম্যাজিস্ট্রেট যাচ্ছিলেন পথ দিয়ে। ম্যাজিস্ট্রেট হলে তো হুমায়ূন আহমেদকে চেনার কথা। অবস্থা তখন নিতান্তই নাকি জোরালো। আমি তো কিছুতেই ছাড়ব না। জাপানিকে সুদ্ধ ধরে নিয়ে যাবো থানায়।

রাইসু: আপনি বার বার থানায় যেতে চান কেন?

হুমায়ূন: কারণ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, ওরা দেখবে। আমি যদি ধরে মার দেই, তো চিল্লাবে ।

সাজ্জাদ: অনেক পাগলামি আছে আপনার মধ্যে।

হুমায়ূন: না, পাগলামি ঠিক না। যে কোন লোকই এ পরিস্থিতিতে এরকম করবে।

রাইসু: সাহিত্যের কোন ব্যাক্তিত্ব দিয়ে কি আপনি মোহাবিষ্ট বা তাঁর মতো হওয়ার কোন ইচ্ছা আছে?

হুমায়ূন: কেউ তো কারো মতো হতে পারে না। একজন হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আহমেদই থাকেন। একজন হুমায়ূন আহমেদ কখনো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হবেন না।

রাইসু: না, ব্যক্তিজীবনের কথা বলছি।

হুমায়ূন: ব্যক্তিজীবনে? এ সমস্ত বড়ো বড়ো লেখকদের ব্যক্তিজীবন সবসময় যে খুব আকর্ষণীয়, তা কিন্তু না।

রাইসু: যেমন ধরুন রবীন্দ্রনাথ ঘুরছেন বেশ, নৌকায় করে।

হুমায়ূন: রবীন্দ্রনাথের এই অংশগুলো আমাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করে তো বটেই। যে কারণে অয়োময়-এর মীর্জা বজরাতে ঘুরে বেড়াতো। কী জন্যে? কারণ শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথেরও বজরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন জমিদার। অয়োময়-এর জমিদার চরিত্রটা তৈরি করার সময় আমার মাথায় ছিল শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথ।

রাইসু: আচ্ছা আপনার প্রথম দিককার উপন্যাসের সঙ্গে এখনকার উপন্যাসের তো একটা পার্থক্য হয়েছে। এটা কী রকম?

সাজ্জাদ: নবনী থেকে আপনার লেখা নতুন একটা বাঁক নেয়া শুরু করেছে। জীবনের কুৎসিত দিক এখন আসছে প্রবলভাবে।

হুমায়ূন: আনতাম না হয়তো বলাটা ঠিক না। নন্দিত নরক-এ তো ছিল ।

সাজ্জাদ: আপনি পরোক্ষভাবে আনতেন।

রাইসু: আমার মনে হয় সবচেয়ে সাহসীভাবে নন্দিত নরকেই ছিল।

সাজ্জাদ: এবারে যে বইগুলো বেরিয়েছে সেগুলোর মধ্যে যখন গিয়েছে ডুবে পূর্ণিমার চাঁদ-এর কথা ধরা যাক। একটা চরিত্র আছে যে মর্বিড একটা চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুরো উপন্যাসে। পড়ে মনে হয়েছে লিখতে গিয়ে আপনি নিজে সাফার করছেন। কারণ এতে আপনি অভ্যস্ত নন। সেজন্যে একদম শেষে ওর বাবার চরিত্রটা আসছে। আসলে বাবার চরিত্রটা এনে আপনি নিজে একটু রেহাই পেলেন।

হুমায়ূন: আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি মর্বিডিটি মানুষের অর্জিত একটা ব্যাপার। জন্মগতভাবে মানুষ মর্বিড না। একটা মানুষকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মর্বিড দেখানোর আমি পক্ষপাতি না। আমি মনে করি শুদ্ধতম চেতনা নিয়ে আমরা পৃথিবীতে এসেছি। যেসব মর্বিডিটি আমরা পাচ্ছি, সেগুলো আমরা সঞ্চয় করেছি। আমাদের মধ্যে সেগুলো দিয়ে পাঠানো হয় নি। যে জিন নিয়ে আমরা এসেছি তার মধ্যে কোনো মর্বিডিটি ছিল না ।

সাজ্জাদ: বিভিন্ন ছেলেরা পড়ছে, তাদের ওপর প্রভাব পড়ছে আপনার। আপনি কি দায়িত্ব অনুভব করেন না যে আপনার কলমের ওপর এতোগুলো ইয়াং জেনারেশনের রুচি নির্ভর করছে? চাপ অনুভব করেন না লিখতে গিয়ে?

হুমায়ূন: লেখাটা কীভাবে তৈরি হয় আমি সেটার ব্যাখা করতে পারবো না। তৈরি হবার পদ্ধতিটি আমি নিজেও পরিষ্কারভাবে জানি না। একটা লেখা যখন আমার মধ্যে আসে তখন সমস্ত মাথা জুড়ে ঐ লেখাটাই থাকে। আর কিছুই থাকে না। শয়নে স্বপনে ঐ লেখাটাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। যখন লেখাটা বের হয়ে চলে যায় তখন মনে হয় মাথার ওপর যেন কেউ বড় একটা পাথর চাপিয়ে রেখেছিলো, পাথরটা সরে গেলো। আমার লেখালেখির ধরণটা হলো কীভাবে পাথরটা সরিয়ে ফেলা যায়। এই পাথরটা সরানোর দিকেই আমার নজর থাকে বেশি। কে এটা নিয়ে কী ভাবছে, কোনো সমালোচক এটা নিয়ে কী বলবে, কে আমাকে ধুয়ে ফেলবে, কে বলবে এটা বাজে হয়েছে–এটা মাথার মধ্যে থাকে না।

রাইসু: কারো কথা মাথায় রেখে কি লেখেন?

হুমায়ূন: না, নিজের দিকে তাকিয়ে লিখি ।

সাজ্জাদ: চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান না?

হুমায়ূন: পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যাই বলে মনে করি ।

সাজ্জাদ: তাহলে চরিত্রগুলো যে মেরে ফেলেন, খারাপ লাগে না?

হুমায়ূন: খারাপ লাগে তো বটেই। অনেক সময়েই খারাপ লাগে। কুসুম বলে একটা নাটক হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমি লিখি। নাটকটি যখন রেকর্ডিং হয় তখন আমার চোখে এতোই প্রবল পানি আসে যে ওখানে যারা ছিলেন তারা বললেন, হুমায়ূন আহমেদকে সরিয়ে নিয়ে যাও। খুব খারাপ লাগছিলো। এটা হয় চরিত্রগুলোর একাত্মতার কারণে। এটা শুধু আমার একার হয় না, আমি মনে করি সবারই হয়।

সাজ্জাদ: লেখার সময় তো বুঝতে পারেন যে চরিত্রটার নিয়তি এমন হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করলে তখন আপনি তার নিয়তি বদলে দিতে পারেন। কারণ আপনার হাতে কলমটা আছে। এরকম আবেগময় মুহূর্তে আপনাকে নিজের বিরুদ্ধে নিজের লড়তে হচ্ছে। আপনার একটা আবেগের সাথে আরেকটা আবেগ লড়াই করছে তখন।

হুমায়ূন: বলা হয়ে থাকে যে লেখকদের হাতে যেহেতু কলম থাকে, লেখক যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। আসলে লেখক যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। ঘটনা যখন দাঁড়িয়ে যায়, চরিত্র যখন তৈরি হয়ে যায় তখন ওদের একটা নিজস্ব জীবন এসে যায়। ওরা নিজেদেরকে নিজেরা নিয়ন্ত্রন করে। আমার কোনো কিছু করার থাকে না। ইচ্ছা থাকলেও আমি পারি না।

রাইসু: অনেক উপন্যাস তো আপনি লিখেছেন। একেকটা চরিত্রের একেকটা জগৎ আছে আপনার কাছে। এদের প্রত্যেকের জগতই কি আপনি অনুভব করতে পারেন?

হুমায়ূন: না, কিছু কিছু আছে যেগুলো অনুভব করতে পারি না। সেগুলো লিখতেই বেশি আনন্দ পাই। যেমন সায়েন্স ফিকশনে অনুভব করতে পারি না। সায়েন্স ফিকশনের জগতটি কল্পনার। সেটি এই পৃথিবীর জগত দিয়ে অনুভব করতে পারি না। কল্পনা দিয়ে সেটিকে ছোঁয়া হয়। অনেক বেশি আকর্ষণীয় সেটি। সেখানে আমি অনেক বেশি স্বাধীনতা পাই। সেখানে আমি আমার কল্পনাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারি।

রাইসু: সায়েন্স ফিকশনে আপনাকে নিয়ন্ত্রন করে কে?

হুমায়ূন: বিজ্ঞান। কোনো কোনো সময় কল্পনাও নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা মনে করি যে, বিজ্ঞান বোধহয় কল্পনাকে প্রশ্রয় দেয় না। বরং বিজ্ঞানই কল্পনাকে মুক্তি দেয়। রুপকথা লেখার যে আনন্দ আছে, আমার মনে হয় একজন সায়েন্স ফিকশন লেখক সে আনন্দটা পান।

সাজ্জাদ: সায়েন্স ফিকশন হচ্ছে আধুনিক সময়ের রূপকথা।

হুমায়ূন: বলা যেতে পারে একটি আধুনিক, অত্যন্ত আধুনিক রূপকথা। যে রূপকথা, রূপকথা নাও হতে পারে। আমরা জানি, দৈত্যের প্রাণ কখনোই ভোমরার ভেতর থাকবে না। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের যে দৈত্য আমরা পাই তার প্রাণ যদি ভোমরার মধ্যে থাকে, তাহলে আমাদের ধরে নিতে হবে এটা সম্ভব ।

সাজ্জাদ: আপনার নিজের তৈরি কোনো চরিত্রের মতো হওয়ার চেষ্টা করেন না?

হুমায়ূন: খুব সচেতনভাবে এটা নিয়ে চিন্তা করি নি। এখন মনে হচ্ছে, আমার মনে হয় না সেরকম। বরং যখন দেখি এই চরিত্রগুলোর দ্বারা কেউ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তখন আমার হাসিই পায়। কোনো ছেলে যদি রাত্রিবেলা এসে বলে যে, আমি হিমু, আমার কাছে মনে হয় এ ছেলেগুলো এরকম করছে কেন?

রাইসু: তাদের মধ্যে এরকম একটা ব্যাপার হয়তো আগেই ছিল। আপনি তাদের শুধু ধরিয়ে দিলেন।

হুমায়ূন: হয়তো আমাদের সবার মধ্যে একটা করে হিমু আছে।

রাইসু: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? অবশ্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঐভাবে জিজ্ঞাসা করাও উচিত না। কারণ আপনার ভবিষ্যৎ তো আর অতো ক্ষুদ্র না। আরো অনেকদিন তো আপনি বাঁচবেন ।

হুমায়ূন: আমার ভবিষ্যৎ তো আর আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না। আমরা ভবিষ্যতেও বাস করি না, অতীতেও বাস করি না। আমরা বর্তমানে বাস করি। আমি মনে করি আমি বাস করি বর্তমানে।

রাইসু: বলা যায় আমরা বর্তমানে বাস করে থাকি।

হুমায়ূন: আমার প্রতিটি মুহূর্তই বর্তমান। আমার জীবিত জীবনে এমন কোনো মুহূর্ত নেই যে মুহূর্ত অতীত বা ভবিষ্যৎ।

সাজ্জাদ: নিজের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগগুলো বলুন?

হুমায়ূন: আমার লেখার বিরুদ্ধে?

সাজ্জাদ: আপনার লেখার বিরুদ্ধে, আপনার নিজের বিরুদ্ধে?

হুমায়ূন: কিছু কিছু লেখাতে, আমি জানি, যদি আরেকটু সময় দেই, আরেকটু বেশি চিন্তা করি, আরেকটু ঠাণ্ডা মাথায় লিখি, খুব সুন্দর করে আমি শেষ করতে পারি। এমনও না যে সে সময়টুকু আমার নেই। এমন না যে আমার ইচ্ছার অভাব আছে। কিন্তু আমার সময়টুকু দিতে ইচ্ছা করে না। এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করি। এক ধরনের চাপ বোধ করি। পাথরের চাপটা বোধ করি। এবং দ্রুত শেষ করে ফেলি। একবার শেষ করে ফেলার পর মনে হয়, এটা কী করলাম?

সাজ্জাদ: এ জন্যই বোধহয় কোনো কোনো চরিত্রকে আপনি পরে আরেকটা উপন্যাসে নিয়ে আসেন?

হুমায়ূন: হ্যাঁ, কাহিনীটা হয়তো পুরোটা বলা শেষ হয়নি, তখন আমার বলতে ইচ্ছা করে। একটা চরিত্রের জন্যে একটা উপন্যাস হওয়াই বাঞ্ছনীয়। একটা চরিত্রের জন্য চৌদ্দটা উপন্যাস হওয়ার কোনো মানে নেই। কিন্তু একটা চরিত্রের জন্য আমার চৌদ্দটা উপন্যাসই লিখতে ইচ্ছা করে। আমি যদি ঠিকঠাক মতো একটি হিমু লিখতে পারতাম, তাহলে চারটা-ছয়টা হিমু লিখতে হতো না। নিজের লেখা সম্পর্কে আরেকটা ব্যাপার আমাকে কষ্ট দেয়। সেটি হলো, একটা লেখা লেখার জন্য যে পরিমাণ প্রস্তুতি আমার থাকা দরকার, যে পরিমাণ পড়াশোনা নিয়ে আমার একটা লেখা লিখতে যাওয়া উচিত, ঐ জায়গাটা আমি অবহেলা করি। আমি মনে করি এটার দরকার নেই। হঠাৎ করে মনে হলো আর লেখা শুরু করলাম। কোনো রকম চিন্তাভাবনা নেই, কোনোরকম পরিকল্পনা নেই, কিচ্ছু নেই। ব্যস, লিখতে বসে গেলাম। যদি একটু পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে অনেক ভালো হতো।

সাজ্জাদ: অনেকেরই অভিযোগ, আপনি নাক-উঁচু।

হুমায়ূন: আমি অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারি না। একটা দূরত্ব বোধ করি। নিতান্ত পরিচিত মনে না হলে তাদের সঙ্গে রসিকতাও করি না। আমার রসিকতা সীমাবদ্ধ থাকে আমার অতি প্রিয়জনদের জন্যে। বাইরের লোকেরা আমার এই রসিকতার অংশটুকু জানে না। আর দ্বিতীয়টি হতে পারে ইউনিভার্সিটিতে আমি মাস্টারী করি। সেখানে শুরু থেকেই যদি আমাকে ঔপন্যাসিক মনে করে নেয়, ধরে নেয় যে তার সঙ্গে ঠাট্টা-ফাজলামি করা যাবে, নাটক নিয়ে আলাপ করা যাবে তাহলে তো সমস্যা। আমি জটিল বিষয় পড়াই, কোয়ান্টাম মেকানিক্স। অমন হলে তো জটিল বিষয়ে যেতে পারবো না। আমি তাই গোড়া থেকেই অসম্ভব রকম সাবধান। ছাত্ররা আমাকে যমের মতো ভয় পায়। এ সমস্ত কারণেই মনে হয়। তা ছাড়া পরিবারের বড় ছেলে। ছোটবেলা থেকেই বড় ছেলেদের মাথার মধ্যে থাকে যে তাদের ছোট ছোট ভাই বোন আছে। তাকে গম্ভীর হয়ে যেতে হয়। সবকিছু মিলে আমার ভেতরে নাক-উঁচু ভাব আছে বলে আমি মনে করি না। তবে নিজের লেখা সম্পর্কে আমার অহংকার অনেক বেশি।

সাজ্জাদ: আপনি তো সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না?

হুমায়ূন: যে পড়ে সমালোচনা করে তার সমালোচনা, কষ্ট লাগলেও, অত্যন্ত আনন্দের সাথে গ্রহণ করি।

ভোরের কাগজ, মার্চ ১৯৯৪

free counters

j j j

একজন গডো বা পিয়াস করিমের প্রতীক্ষায় শহীদ মিনারে তার লাশের শূন্যস্থানটি যা ভাবছে

আপনি কি একজন ঢাকাই কালচারাল সেক্যুলার। তাইলে আমার কথাও আপনি শুনবেন। কারণ আপনি উদার, পরমতসহিষ্ণু ও অন্যের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন।

আপনার মধ্যে শহীদ মিনার লইয়া যেই পবিত্রতার আহাজারি জাইগা উঠছে এইটারে আমি ধর্মীয় পবিত্রতা বোধের বা সেকরেড চৈতন্যেরই জাগরণ বলতে চাই।

আপনারা যে এত পবিত্রতার ধজ্বা তা এতদিন কী প্রক্রিয়ায় লুকায় রাখছিলেন! মৃত পিয়াস করিম আপনাদের মধ্যে এই অগ্নি বা ফায়ার জাগায় দিলেন কি? তাই যত ঘৃণা তারে আপনারা করতেন তাতে আরো ঘৃণা যুক্ত করতে পারেন। মৃত পিয়াস আপনাদের লইয়া হাসতে হাসতে মড়ার খাট থিকা উইঠা বসতেও পারেন। কিন্তু আমি এই নিয়া কৌশলগত কারণেই এখন হাসতে চাই না। আমি চাই বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ। যেই যোগাযোগ আমারে বলবে কীভাবে আপনারা এত কনট্রাডিকশন পেটের মইধ্যে ভইরা রাখতে পারেন।

এবং আমি সিরিয়াস ভাবেই বলব, এইটা আপনাদের ধর্মেরই অনুকরণ। স্বতঃ ঘটমান রিয়ালিটি ইনি নন।

জানাযার নামাজ না পড়াইতে চাওয়ার যে মোল্লা সামাজিক অসম্মতি, আপনাদের সেক্যুলার শহীদ মিনার থিকা সেই অসম্মতিই আজান দিতাছে। পাড়ার সবাই যেমন ঠিক করে এই শয়তানের জানাযা হবে না, এই ‘শহীদ মিনারের মধ্যে কোনো পিয়াস করিম হবে না’ও সেই রকম অসম্মতিই।

এখন আপনাদের শহীদ মিনারে যেহেতু বাংলার অমিত ‘শয়তান’ বুদ্ধিজীবী (মারা গেছেন তায় এখন তার শরীর ঠাণ্ডা তাই রসিকতা করলাম) পিয়াস করিমের লাশের একটা অনুপস্থিতির উপস্থিতি তৈরি হইছে–এই পুরা ব্যাপারটা দীর্ঘকালীন একটা জনসাংস্কৃতিক থাইকা যাওয়া ট্রাফিক জ্যাম, সেশন জট বা ব্রিজ তৈরি না-হওয়া হিসাবে আপনাদের কালচাররে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকবে। আপনাদের বার বার দেখাইতে হবে আপনারা কতই না সেক্যুলার, পবিত্রতা-টবিত্রতা আপনাদের হাতের মোয়া মাত্র।

কিন্তু আপনাদের জন্যে কী রোদনে ভরা এই অক্টোবর, শহীদ মিনার নামটাই এখন পিয়াস করিম নামের লগে খাপে খাপ হইয়া গেল।

বহুদিন আর আপনারা পিয়াস করিমের চেহারা মনে না কইরা শহীদ মিনার ভাবনাটি ভাবতে পারবেন না।

দেখবেন, গডো বা পিয়াস করিম নামের এই ‘পাকিস্তান’টা, ‘জামাত-শিবির’ করা এই হাফ ডেডটা যাতে না পবিত্র শহীদ মিনারে কোনো দিক দিয়াই রাতের অন্ধকারে ঢুইকা না পড়ে।

১৭/১০/২০১৪

j j j

শব্দকল্পদ্রুম: ‌‌’বুদ্ধিজীবী’

গণতান্ত্রিক সমাজে, সাধারণ মানুষের চাইতে কম কাণ্ডজ্ঞান ও অধিক তথ্য ধারণকারী অর্গানিক বস্তুদশার নাম বুদ্ধিজীবী।

একই ধরনের কথা কে কে আগে বলছেন তার হদিস প্রদানের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবীদের গুরুত্ব ও উৎকর্ষ নির্ণীত হয়।

এই বর্গের স্তন্যপায়ীরা সাধারণত রাজধানীতে ঘাপটি মেরে থাকে। এরা ইউনিভার্সিটি গ্রান্ড কমিশন, ভিনদেশি সাহায্য সংস্থার অদরকারি অনুবাদ ও খবরদারি উপার্জন পদ্ধতিতে বারোমাস নিষিক্ত থাকে।

আপন মুখনিসৃত বাণীসমূহের ব্যাপারে এই জৈববস্তুটি সবচাইতে নিশ্চিত ধারণা পোষণ, প্রমাণ ও প্রচার করে।

প্রধানত প্রতিপত্তি ও দ্বিতীয়ত অর্থের বিনিময়ে জনস্বার্থের অবিরল গোয়া মারাই বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবদান।

সাধারণ মানুষের বাসাবাড়িতে টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে বুদ্ধিরা হানা দিয়ে থাকে। তুলনায় অধিক বুঝদার গণমানুষের মগজ ধোলাইয়ের নিমিত্তে এরা সেখানে অন্য বুদ্ধিদের সঙ্গে তথ্য ও নিশ্চিতি বিনিময় করে। লোকে এই লেনদেনকে ‘টকশো’ নামে অভিহিত করে থাকে।

১৩/১/২০১৪

j j j

কোনো প্রবীণ বুদ্ধিজীবীর সরকারপন্থী অকাল মৃত্যুতে

যারা, তোমার মুখে কল বসাইল আলজিভের

তাদের, মনের কথাই তোমার মুখে অনর্গল

 

শুনলে, তব বদনখানি টিভির মতই অহৈতুক

লাগে, কিন্তু কণ্ঠসহ।

অর্ধ, জ্যান্ত কোনো যাদুঘরের মমির ন্যায়।

 

তারা, যা শুনতে চায়, না হয় আজকে তুমি তা বললা

তবে, তোমার কথা কবে তুমি বলবা গো?

 

১১/১/২০১৪

j j j

অন্বেষণ

নাইনটিন নাইনটি ফাইভে আমি অন্বেষার সঙ্গে পরিচিত হই। একটি ঈদের দিনে ছফা ভাইয়ের বাসায় গেছিলাম। দুপুরে। দেখলাম ছফা ভাই ঘুমান। আমি পা ধোওয়ার নিমিত্তে পাশের ঘরে গেলাম। ধুলাবালিতে স্পঞ্জের স্যান্ডেলও ময়লা হইত তখন। দেখলাম ছোট গোছলখানার একটা পাশে বিছানো চকিতে সোজা হইয়া একটা মেয়ে ঘুমাইয়া। আমি পা ধুইতে ঢুকলাম। বাইর হইয়া দেখি–এক পাশে চুল নামাইয়া দিয়া বইসা আছে ভদ্র মেয়েটি–লম্বা কালো মাথাভরা চুল কোমর পর্যন্ত নামতেছিল। একটু মোটা–কিন্তু গা ফর্সা বইলা আমারে আকর্ষণ করলো। দেখি নড়ে না। তাকায় ছিলেন কি উনি? এতদিন পরে আর তাকানোটা মনে নাই।

অন্বেষার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল অল্প দিনের। সব মনে নাই। পর দিন গিয়া দেখলাম ছফা ভাইয়ের একটা বেগনি সিল্কের শার্ট আর লুঙ্গি পইরা বোধহয় মোড়ায় বা ছোট টুলে বইসা আছেন অন্বেষা। Read More

j j j

হালুমহুলুমভালুমবাসা: লাভ ইন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট

বাঘের সঙ্গে হলো ভালোবাসা শুরু
লাজে মরি ডোরাকাটা, বক্ষ দুরু দুরু!

কে জানে বাঘের মর্জি
আমাকে কি ভালো লাগবে তার?
রাজি কি গরগররাজি
করিলে সংহার–

যদি আমি মরে যাই
বেঁচেবর্তে তরে যাই
এ ভবসংসার–

বাঘের দেখা কি আর পাবো, এ জীবনে?
পাবো না তো!

বাঘেরই সঙ্গে তবু ভাব হবে
এ ঘোর মণ্ডলে
আমি একা একাকিনী

বাঘের বাঘিনী

হবো, আর বসে রবো বাঘেরই কারণে
দূরে দূরে
বাঘ কি তা বুঝতে পারবে?
নাকি ভুল বুঝবে আমাকে? বাঘ
বুঝবে আমাকে?

j j j

টুশি হিমু হুমায়ূন এবং এবং হিমু…

হুমায়ূন আহমেদের বই এবং হিমু... (১৯৯৪)

হুমায়ূন আহমেদের বই এবং হিমু… (১৯৯৪)

হুমায়ূন ভাই আমারে যে বই উৎসর্গ করছিলেন সে বইয়ের নাম এবং হিমু…। ডটসহ।

“ব্রাত্য রাইসু যে মাঝে মাঝে হিমুর মতো হাসে”–এটুকু লিখেছিলেন উৎসর্গপত্রে। এই নিয়া খুব বিরক্ত হইছিলেন সে সময়ের ইয়াং ফ্রেন্ড রোজিনা মুস্তারিন টুশি। এর আগে আমরা একবার হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায়ও গেছিলাম হাতিরপুলের কোনায় বোধহয় সাততলায়। উনি টুশিরে টিস্যু বলতেছিলেন ভুল করার ভান কইরা। আর টুশি নিজের নাম শোধরাইতেছিলেন বার বার।

তো টুশি হিমুর মত হাসার ব্যাপারটা মানতে পারতেছিলেন না! মেলায় দেখা হইলে বেশ গুরুত্ব নিয়া আপত্তি জানাইলেন যে, আমারে বই উৎসর্গ করায় হিমু চরিত্রের মানহানি ঘটছে! আমি বললাম হুমায়ূন ভাইরে বলতে।

টুশি নিয়া একটা লেখা লিখছিলাম দুর্ঘটনায় ছাদ থিকা ওনার পইড়া মারা যাওয়ার বেশ পরে–৭ বছর পরে–“রোজীনা মুস্তারীন টুশির একটা ছবি“।

সে লেখায় তাঁর এই অপছন্দের ব্যাপারটা আসে নাই। হিমু নিয়া হুমায়ূন ভক্তদের যে মহামারী ভালোলাগা আছে তাতে ওই ভদ্রলোকের মত হাসতে পারাটা আমার একটা যোগ্যতা হিসাবে ধইরা নিতে পারলে ভালো হইত। কিন্তু দেখলাম, বোদ্ধা পাঠক-লেখকরা হিমু নিয়াই বরং হাসাহাসি করে!

আমি হুমায়ূন ভাইয়ের সে প্রশংসা বা সায় থিকা সাবধানে দূরত্ব বজায় রাখছি। মে বি হইতেই পারে সে কারণেই পরে আর তেমন কইরা ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করি নাই। কেই বা বলেন, এই আমলে হলুদ পাঞ্জাবি পরা রোমান্টিক যুবকের মতো হাসতে চাইবে!

রোজীনা মুস্তারীন টুশি (৮/৪/১৯৭৮-২৭/৪/২০০২)

রোজীনা মুস্তারীন টুশি (৮/৪/১৯৭৮-২৭/৪/২০০২)

j j j

আওয়ার ছফা অ্যান্ড আজাদ

sofaazad

ছবিতে পাশাপাশি হুমায়ুন আজাদ ও আহমদ ছফা

আমি ছফা আজাদ দুইজনরেই পছন্দ করি–করতাম। আজাদের বাসায় একাধিকবার গেছি। মেইনলি ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্যে। এছাড়াও গেছি। একবার মনে আছে, বিকালের দিকে, বোধহয় ব্রিটিশ কাউন্সিলের দিকে হাঁইটা ওনাদের কলোনি পার হইতেছিলাম আমি আর সাজ্জাদ শরিফ ভাই। তখন আমি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে উপন্যাস লিখি দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায়– যোগাযোগের গভীর সমস্যা নিয়ে কয়েকজন একা একা লোক। সাজ্জাদ ভাই ভোরের কাগজে আছেন। তো স্যার–স্যার নামেই ডাকতাম ওনারে–আমাদের দেখতে পাইলেন রাস্তায়। বললেন, কী ব্যাপার তোমরা! এখানে কী করছো! ওনার কণ্ঠস্বর, ‘এখানে কী করছো’ ভালো লাগল না আমার।

আমি বললাম, স্যার বিকাল বেলা মেয়ে দেখতে বাইর হইছি!

উনি প্রথমে অপ্রতিভ হইলেন–পরে সপ্রতিভ হইয়া হাইসা ফেললেন। বললেন কী বলো এগুলো, ওরা তো আমাদের মেয়ে! আমি বললাম, হ্যাঁ স্যার, ওদেরই দেখতে বাইর হইছি!

উনি বললেন, চলো, কাজ না থাকলে বাসায় চলো। আমরা ওনার বাসায় গিয়া চা বিস্কুট খাইলাম।

হুমায়ুন আজাদ স্যার সাবলীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ওনার সঙ্গে নানান জায়গায় দেখা হইত। প্রধানত আজিজ মার্কেট শাহবাগে। উনি সাদা কেডস, নেভি ব্লু জিনস আর সাদা টি শার্ট বা কখনো হাফ শার্ট পইরা আসতেন। আমারে আর সাজ্জাদ ভাইরে পারতপক্ষে ঘাটাইতেন না।

আমি ওনার একটা সাক্ষাৎকারের বই নিয়া একটা আলোচনা লিখছিলাম বাংলাবাজার সাময়িকীতে, ১৯৯৪ বা ৯৫-এ। বইটা যে পড়ি নাই তখনো তার উল্লেখ আছিল আলোচনায়। (সে বই অবশ্য এখনো পইড়া উঠি নাই। পড়মু।) সাক্ষাৎকারদানকারীদের ও ওনার চশমার বর্ণনা, কে কার দিকে চাইয়া আছে প্রচ্ছদে সে সব লিখছিলাম। উনি পইড়া খুশি হইছিলেন। বলছিলেন, তুমি না পড়েই যা লিখেছো, ওরা তা পড়েও লিখতে পারবে না।

ওনার অনেক গল্প আছে, আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল বইলা সব মনে পড়ে না। সাজ্জাদ ভাইয়ের দেখছি অনেক কিছু মনে আছে। ওনারে জিগাইলে আবার আমারও মনে পড়বে। তেমন মনে পড়া ঘটলে আরো লিখব। ছফা-আজাদ দুই জনেরই আদর্শবাদ আছিল। যে যে আদর্শের তার কাছে তাঁর তাঁরটা হয়তো ভালো লাগবে। আমার আদর্শবাদ ওইভাবে কখনোই ছিল না। দুইজনের সঙ্গেই আমি মিশতে পারতাম। তবে ছফা ভাই যেমন পুত্রবৎ জ্ঞান করতেন আজাদ তেমন করতেন না–তিনি জ্ঞান করতেন ছাত্রবৎ। কিন্তু আমি কখনোই তার ছাত্র তো ছিলাম না, বৎও ছিলাম না। কোনো একটা ইন্টারভিউতে আমাদের ফাজিল সম্বোধন করছিলেন আজাদ স্যার। আমরা–অন্তত আমি তাই ছিলাম। এখনও আছি। ভদ্রলোকদের অফাজিল ভদ্রতার মায়রে বাপ!

১৯/৭/২০১৩

j j j

শোকের উল্লাস!

উৎসর্গ: সাভার হত্যাযজ্ঞে বেঁচে যাওয়া ভাইবোনদের

তাই তারা ভালোবাসে শোক করতে,
ছোটলোক গণহারে মরলে পরে মধ্যবিত্তের বাপের রাষ্ট্রটি
আর পুত্রবৎ কন্যাসম মধ্যবিত্ত সমাজ–
করে জোরেশোরে
রাষ্ট্রীয় নরম অনুচ্চকণ্ঠ স্নিগ্ধতাময় শোক।
যেন একবার শোক করা গেলে পরে আর কিছু
করাই লাগবে না!

যেন গণশোক উদযাপনে কত দুঃখ করা গেল!
আবার আরেকবার গরিবের হত্যাযজ্ঞ করা গেলে
আবারও করবে শোক
দেশব্যাপী করবে তারা শোকের উল্লাস!

২৭/৪/১৩

j j j