স্তন

স্তন । এই নারীবাক্য অধিক বিশেষ্য। মহাপ্রাণ ধ্বনিতে নির্মিত মাত্রা -জ্ঞান -শূন্য গোলক। অদৃশ্য বলয়যুক্ত যাদুঘর। ক্রমস্ফীতি। মেটাফিজিক্স। গোলক–যা বর্তুল, প্রাণময় । এই স্তন ধর্মসংক্রান্ত।

প্রিয় স্তন, খুলে বক্ষবন্ধনী আজ আব্রু রক্ষা করো ।

ঐ স্তন দ্যাখো লাফিয়ে উঠেছে শূন্যে — মহাশূন্য: বিপরীতে সামান্য শূন্যের। ওই ভীত শিশুদের জন্ম হচ্ছে যত্রতত্র –তারা গান গাইছে জ্যামিতির–করুণামিতির। হেসে উঠছে বর্তুলজাতক। কী যেন বাঁশির ডাকে জগতের প্রেমে, বাহিরিয়া আসিতেছে সলাজ হৃদয়।

কেন এই স্তন বার বার! বাৎসল্যবিহীন যারা, লক্ষ করো, কীভাবে ব্যক্ত হয়ে উঠছে বাহুল্য; ওই ব্যক্তি হয়ে ওঠে স্তন–নারীবাদিনীর, ছুঁড়ে ফেলা ছিন্ন স্তন ফুঁসে উঠছে স্বীকৃতিসংক্রান্ত। তাকে দাও অধিকার– বিন্যস্ত হবার; তাকে শিশুদের হাত থেকে রক্ষা করা হোক!

ঐ স্তন ঘিরে ঘুরে আসছে মারাত্মক ভাবুক প্রজাতি। ভয়ে ও বিনয়ে, নুয়ে পড়ছেন অধ্যাপক–বিশুদ্ধ জ্যামিতি। ঐ স্তন ঘিরে উঠেছে সংক্রামক নগরসভ্যতা; ফেটে পড়ছে ত্রিকোণ-গোলক–

ঐ স্তন জেগে উঠেছে চূড়ান্ত —

ডাকো স্তন, হীনম্মন্যদের!

১৯৯২

Flag Counter

সামন্ত

এই যারা কাজ করছে
চারিদিকে
উত্তাল পাহাড় কুঁদে তুলে আনছে
অষ্টাবক্র মুনির রূঢ়তা
তাদের প্রহরা করি
আয়তক্ষেত্রের রাজা সুসামন্ত আমি এই
চরণে রয়েছে চিহ্ন ইশ্বরের
–প্রপিতামহের।

চারিদিকে এই যারা ছড়ানো ছিটানো
নুয়ে পড়া, হীনমুখ, ব্রাত্যজন
জনতা যাদের নাম
ওঠে বসে শোয় যারা অঙ্গুলিনির্দেশে
প্রত্যহ তাদের জন্য কৃপা করি
কৃপাভিক্ষা করি। যেন
ইশ্বর উদ্দিষ্ট দেন–
তাকান নিচুতে।

আমার পায়ের কাছে
এত এত নিবেদন
রাজভক্ত, গণ্ডগ্রাম, খঞ্জ ও রমণী
সবারই মস্তক নিচু
জ্ঞানভারে–
সব মুখ অন্ধকার
সব ভক্ত নুয়ে নুয়ে হাঁটে
কেননা তাদের
পদচ্ছাপে উল্লিখিত জন্মের রহস্য
আর মৃত্যুর নিদান।

পবিত্র মৃত্তিকা শুধু
উদগীরণ করে–
যা কিছু সংযতবাক
জড় ও পুরাণ–যা কিছু শিলায় সৃষ্ট
শিলাপ্রাণ ধরে–
তাদের ব্যগ্র মুখ উদ্যত শরীর
হেঁকে উঠছে একে একে
আমার চারপাশে।

এবং যা কিছু দেখো,
সমস্তই নির্ধারিত
একমাত্র আমার–
যা কিছু দূরত্ব আর
যা আছে নিকট–যা যতো মনুষ্য আর
তাদের নিজস্ব
যা আছে রমণী আর পালের শিশুরা

দিগন্ত অবধি সব আমার সন্তান।

১৯৯২

Flag Counter

এই যদি গ্রামবাংলা

এই যদি গ্রামবাংলা–ভালো লাগল

ভালো খুব–ট্রেনের জানলা দিয়ে

দেখা গেল গ্রামবাংলা –বৃষ্টিটলমল

প্রাকৃতিক সংবেদনা–কৃষকের ছেলে

মাছ ধরছে খালের পানিতে

এসে বাতাস লেগেছে–ঢেউ

জেগেছে বর্ষায়

হাঁটছে মাটির রাস্তায়

সিক্ত ছাগলের পাল–আর

ট্রেনের জানলায়–দেখা যাচ্ছে

মধ্যবিত্ত–জর্জরিত মধ্যবিত্ত

চিপস খাচ্ছে–চিপস খাচ্ছে–চিপস খাচ্ছে–আর

দেখে নিচ্ছে গ্রামবাংলা –আজিও বর্ষার ।

 

১৯৯২ (?)

 

kalidas1

Flag Counter

হাঁদাগঙ্গারাম

বিচলিত গঙ্গারাম। আমার বন্ধু। তার কথা কী লিখিব! “কী লিখিব!” এই বাক্য জিজ্ঞাসা নয়, হায় হুতাশ।

তার সমস্যা ব্যক্ত হওয়ার। এবং গঙ্গারাম, কী অর্থ হয় এই বেঁচে থাকার? এই তোমাকে নিয়ে কবিতা লিখছি আমি। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। আহা আমাদের দিনগুলি।

এবং আজি দিন যায়। দিন বড় তাৎক্ষণিক যায়। দিন তোমার সঙ্গে কোনো সংশ্রব রাখছে না। তুমি নিতান্ত এক গঙ্গারাম। লক্ষ রাখো সর্বদাই, যাতে-না ক্ষুণ্ন হয় শিল্পের সুষমা। যাতে, যথার্থ শিল্পের কথা সর্বদাই বলে যেতে পারো।

আজ মন বড় উতলা। আজ মন তোমার কথাই।

জ্যামিতি-আসক্ত গঙ্গারাম। গভীর বৃত্তে বসবাস। ইউক্লিডিয়ান। ঘূর্ণন গতিবিদ্যার বিষয়। তার প্রতি নিবেদিত শাশ্রুকথন। পাঠকালে দু’নয়নে জলসংসর্গ প্রয়োজন। বিশুদ্ধ খনিজ। অথবা উড্ডীন:

১.
গঙ্গারামের দুঃখ, দুঃখের কারণ—শুনবেন, শুনবেন—কিন্তু
কারো কাছে প্রকাশ করবেন না।

২.
এবার দাঁড়াও উদাহরণ
যা কিছু কার্য এবং কারণ
সম্প্রসারিত হোক।

৩.
পরম্পরার প্রতি অধিক ভক্তিতে
নুয়ে পড়ছে গঙ্গারাম, তার
ছায়া পড়ছে উপচ্ছায়াবৃন্দের মাথায়।

৪.
ঐ যে নবিশবৃন্দ, মহাদশাপ্রাপ্ত তারা ক্ষুদ্র আয়তনে
আহ্নিক-বার্ষিক গতি লক্ষ রেখে সাহিত্যবিস্তার
করিতেছে, তাহাদের সঙ্গে বলো তোমার কী দরকার?

৫.
স্বতঃই ঘটনা তাই সদাই ঘটছেন
তুমি থাকো কিংবা নাহি থাকো
তাহারা থাকছেন।

৬.
কী বোঝে শরৎবাবু, যে তাঁর সঙ্গে হাঁদা গাধাগঙ্গারাম
বসে থাকবে একই ঘরে
কথা বলবে স্পষ্টতই, সাহিত্য বিষয়ে?

৭.
ঠোলাদের তার মনে হয় পাখি
তাদেরই সঙ্গে
যত ডাকাডাকি।

৮.
ও ভাই তদানীন্তন,
দিন যে গেল দেখতে দেখতে
এখন কী করি?

৯.
আজ দুঃখের দিনে ঠাকুর মহাশয়
অনেক দূরে থাকেন।

১৯৯২

ছাগল

উহা চতুষ্পদ। কারণ চার পা। যাহা ক্ষুরযুক্ত। অ্যালয়ের। কেননা ভূত্বক মাড়াইয়া চলে। তখন শব্দ হয়। এই শব্দ, বিশারদরা বলেন, মৃদু  শব্দ।

যাহা ছাগল তাহা বিশেষ্য, তাহা সর্বনাম, তাহা বিশেষণ, এবং অব্যয়, আর ক্রিয়া। আর তাহার ক্রিয়া—অব্যয়।

২.
এবং কেন এমন হয় যে তার কোনো গৃহ নয়। হায় জ্যামিতির অভিভাবক। নিখিল বৃত্তের পরিব্রাজক তুমি। আজ সর্বজনীন ছাগল ডাকছে। গোবি সাহারা সাইবেরিয়ায়।

৩.
এবং এই সংযোজক অব্যয়, যা অব্যাহত রাখে তোমার সঙ্গে তোমার প্রপিতামহের মূঢ়তা—অর্থাৎ জ্ঞান—অর্থাৎ সন্দেহ।

হায় সাধারণীকরণ, ভাষাবিজ্ঞানের জাজ্জ্বল্য সমস্যা। কেঁদে উঠছে বার বার। হায় প্রাণিজগতের ফুলস্টপ, তুমি ক্রন্দনবিদ্যার জননী। হায় সার্বভৌম তৃতীয় সন্তান। বৃত্তাকারে ঘুরে যাচ্ছো। কোন দিকে, এবং সেইসব ছাগলেরা আজ কোথায়, যারা নিজেদের দড়ি নিজেরাই খেয়ে ফেলেছিল?

আর এই সন্নিহিত ভদ্রতাবোধ। ব্যক্তিত্বের বর্ষাকাল। হায় খোদার খাসি। চূড়ান্ত স্বাধীনতার কনসেপ্ট। তুমি অধিক মানব। স্রষ্টার ব্যক্তিগত প্রাণী। আজ মুখ খোলো—

হায় ব্যা, হায় অব্যক্ত সম্প্রদায়!

১৯৯২