ফুল বিষয়ক অবধারণ

এক.

যখন রাত্রি হয় তিনি আসেন। হাতে ফুল। দেখি হাসছেন। আমিও হাসলাম। তিনি হাসতে হাসতে ঘরে ঢুকলেন। জিজ্ঞেস করলেন ভালো আছি কি-না। নাম জিজ্ঞেস করায় বললেন ‘ফুলিস’।

পরে জেনেছি, ফুল ভালোবাসেন বলেই এ-নাম। ভদ্রলোক এসেছেন দায়িত্ব পালনের জন্যে। জানতে চাইলেন কয়বার হয়েছে। আমি ‘না’ বলতেই তিনি দপ করে গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন, ‘যান গিয়া ঢোকেন এখনই।’

আমি টয়লেটে ঢুকতেই তিনি বাঁশি বাজাতে শুরু করলেন।

 

দুই.

মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক এলেন ফুল নিয়ে। ‘কী ব্যাপার, ফুল কেন!’ তিনি বললেন, ‘আই লাইক ইউ ভেরি মাচ, দয়া করে ফুলটুকু ফিরিয়ে দেবেন না।’

আমি নিলাম তাঁর ফুলটুকু, ‘আপনার বউবাচ্চা কিছু নেই?’

‘জ্বি আছে। বউ আছে। বাচ্চা নেই। নিজের বাগানের ফুল।’

‘ফুল খুব ভালোবাসেন বুঝি?’

‘না, তা না। আপনাকে দেখে খুব ভালো লাগলো।’

‘আপনি থাকেন কোথায়?’

‘থাকি সামনেই থাকি। আমার ওয়াইফের বয়স ছাববিশ।’

‘ছাববিশ কেন?’

‘আমি জানি না।’

‘তাই নাকি? ঠিক আছে। নিয়ে আসবেন তাঁকে।’

‘ঠিক আছে।’ ভদ্রলোক হাত নাড়িয়ে চলে গেলেন।

পরদিন ভদ্রলোক আসলেন তাঁর বৌ নিয়ে। আজকে ভদ্রমহিলার হাতে ফুল। বললেন, ‘আমি খুব ফুল ভালোবাসি।’

আমি হাসলাম, ‘তাই? কী নাম আপনার?’

‘আমি জুলেখা’ ভদ্রমহিলা এমনভাবে উচ্চারিলেন যেন জ-এর মধ্যে ঢুকে গেছে আস্ত একটা অন্তস্থ য আর তালব্য শ।

আমি বললাম, ‘যুলেখা বাদশার মেয়ে।’

ভদ্রমহিলা তাঁর বুকের ওপর কী একটা দোলা দিলেন, আর কীভাবে যে দিলেন যে আঁচল খসে পড়লো তাঁর কোলের ওপর, আর হাসলেন হা হা।

আমি বললাম, ‘কতদিন হয় বিয়ে করেছেন?’

ভদ্রমহিলা তাঁর হাসি থামালেন, ‘জী ছ’ বছর।’

‘বাচ্চা নিচ্ছেন না কেন?’

‘ওর সমস্যা আছে।’ ভদ্রমহিলা তাঁর চোখ ঘুরিয়ে নিলেন তাঁর হাতের ফুলের মধ্যে।

‘এসব কি আর এখন কোনো সমস্যা?’

‘সে জন্যেই তো আপনার কাছে আসা।’ ভদ্রলোক মিষ্টি করে হাসলেন।

ফলে কারেন্ট চলে যায়। আমি মোমবাতি জ্বালি। ‘আপনার মাপ কত?’ আমি যুলেখার চোখের দিকে তাকাই। ভদ্রমহিলা তাঁর শাড়ি খোলা শুরু করেন।

আমি ভদ্রলোককে বলি, ‘আপনি বরং হাত দুটি ধরুন। আমি ঠিক নরমালি আনন্দ পাই না।’

ভদ্রলোক এসে তাঁর স্ত্রীর হাত ধরলেন। ভদ্রমহিলা বললেন, ‘খানকির বাচ্চা!’

কাকে বললেন কে জানে।

 

তিন.

আমি যখন খেতের মধ্যে পাটের বীজ বুনছি, জানতাম না কেন বুনছি এই বীজ। মানে, জানার দরকারটিই পড়েনি। আমার বাপ, তার বাপ, তার বাপের বাপ সকলেই কেন কী করছে না-করছে সব বুঝে ওঠার আগেই নানাসমস্ত কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছে।

ফলে, যখন পাটের গাছ ধীরে বড় হয়, আমি জানতাম না কেন বড় হয় গাছ। আর যখন কিছু পাটের গাছ এনে ভিজিয়ে দিলাম খালের পানিতে, আমার মন করে উঠল হু হু, আমি জানতাম না কেন, ভাবলাম চৈত্রের বাতাস। আর সেখান থেকে কিছু পাটের আঁশ আলগা করে দিলাম শুঁকোতে। তারপর দড়ি পাকানোর জন্য খুঁজতে গেলাম লাইলিকে। দেখি লাইলি মাছ ধরে।

আমি বলি, ‘দেখ লাইলি, এই যে কত পাটগাছ, আর তুই মাছ ধরিস।’

লাইলি বলে, ‘তোমার মনে রঙ লাগছে মামা।’

আমি বলি, ‘এই যে এত পাটগাছ বড় হয়ে যায়, জানিস কিছু কেন হয়?’

সে বলে সে জানে, আর আমার কানে কানে এমন আওয়াজ দেয় যে আমি তো আমি, আমার চৌদ্দগোষ্ঠীর মাথা যায় বিগড়ে। আমি বলি, ‘চল লাইলি চল, দড়ি পাকাবি।’

আর আমরা গিয়ে ঢুকি একটা পাটখেতের মধ্যে। লাইলি বলে, ‘তুমি কি মামা এই গল্পেও সেক্স ঢুকাবা নাকি?’

আমি বলি, ‘না, অন্য কিছু।’

আর লাইলি করে কী, হাসতে হাসতে তার জামা-কাপড় ছেড়ে ছেড়ে ছিটকে ছিটকে বেরোয় আর আমরা ঘরে ফিরে আসি।

আমি বলি, মামা কী সর্বনাশ তুমি করলা আমার। মামা কিছু বলে না, আমি কাচারি ঘর থেকে সব পাকানো দড়িদড়া এনে গাছে গাছে ঝুলিয়ে দেই দেই দেই কিন্তু…

লেখকের আগমন

আমি করলাম কী, আগের গল্পে না পাওয়া দুটি ফুল দিলাম মেয়েটির হাতে ধরিয়ে। মেয়েটি, লাইলি, খুব বুদ্ধিমান, বলে, এই এক জিনিস পাইছেন আপনে।

‘তো, এখন আপনি কী করবেন?’

কী করবো মানে? আমারে ভোদাই ঠাওরাইলেন নাকি, আরে দেখেন না ভাই… আর করে কী, লাইলি, তার নিঃসঙ্গ ও উদোম পেট বাগিয়ে ধরে আমাদের সামনে–সেখানে জন্মশাসনের মার্কিনী বিজ্ঞাপন ও আমরা চুমু খাই।

 

চার.

ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন খসরু ভাই: চিনছো নাকি রাইসু, বিশিষ্ট মাগীবাদী লেখক।

আমি ভদ্রমহিলাকে হাতজোড় করি, ‘ক্ষমা করবেন দিদি, আমি থাকি একেবারে বিবর্জিত এলাকায়। তবে আপনাকে কোথাও দেখে থাকবো।’ এইটা ফাও মারলাম। একে আমি ইহজনমে কোথাও দেখি নাই। ‘কী নাম আপনার?’

‘সি কঙ্কা।’

‘ও আচ্ছা। মহান নাম। আগে শুনেছি।’ আমি ভদ্রমহিলার হাতে একটা রজনীগন্ধার স্টিক ধরিয়ে দিই। ‘শুভকামনা।’

ভদ্রমহিলা দণ্ডটিকে সাত-আট ভাঁজ করে পকেটে চালান করেন। ‘এইসব ফুল-টুল দিয়ে কিছু হবে না মিস্টার। ফুল মানুষের খাদ্য নয়।’

‘তা ঠিক। ফুল খাওয়া ঠিক হাইজেনিক না।’

এরপর সাড়ে তিন বছর পর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা। লঞ্চে। তিনি বরিশাল যাচ্ছেন। বললেন, ‘বরিশাল খুব সুন্দর জায়গা।’

আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম।

তিনি হাসলেন। ‘আপনার গল্পের ব্যাপারে কথা বলতে চাই আমি।’

‘জ্বী, প্রকাশেন।’

‘আপনার গল্পে তো জীবন নেই। শুষ্ক গল্প। না লিখলেই পারেন।’

আমি বলি, ‘এভাবে বলছেন।’

‘না। গল্প এক জিনিস। স্টান্ট আরেক জিনিস। জীবনের কাছে থাকুন। মানুষের কাছে থাকুন।’

‘জ্বী, তাই তো আছি। মানুষ তো আমার খুব পছন্দের। বিশেষত মেয়ে মানুষ।’

‘ঐখানেই তো আপনাদের সমস্যা। মেয়ে মানুষ! পণ্য হিসেবে দেখেন নাকি মেয়েদের?’

‘জ্বী। তা দেখি। উত্তম পণ্য।’

এবার ভদ্রমহিলা রেগেছেন। তাঁর কেশর ফুলিয়ে ঠকাঠক পা ঠুঁকে গর্জাতে লাগলেন।

সম্ভবত এসব কারণেই আমাদের লঞ্চটি ডুবে গিয়ে থাকবে।

 

১৯৯৩; সংবেদ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪ সংখ্যায় প্রকাশিত

 

Flag Counter

পুরোনো বন্ধুদের থেকে সাবধান

তো, পুরোনো আমার যে-বন্ধু সে আমাকে সকালে যোগাযোগ করে। আমি বলি, কী ব্যাপার, এতদিন কোথায় ছিলেন?

তিনি রুষ্ট হন: হারামজাদা, আপনে কইরা কইতেছো যে!

আমি ‘সরি’ বলি। সে বলে, ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেছি, বাসায় থাকবা নাকি?’

আমি বলি আমি খুব ব্যস্ত। কিন্তু সে বলে রাতে কোনো কাজ আছে নাকি? আমি বলি, ‘কখেন?’ সে বলে, ‘রাতে।’ আমি ভয় পাই। বলি, ‘রাতে সময় হবে না, বরং দিনের বেলায়ই; এবং আমি নিজেই আসছি, তোমার ঠিকানাটা বলো।’

সে ঠিকানা বলে। আমি তার বাসায় যাই।

তার বাসা যথারীতি। বিবাহিত। কাজের মেয়ে আছে। অসুন্দর; এবং—বাগানে ডালিয়া ফুল। বাগান মানে বারান্দা। বারান্দায় অনেক টব। টবের ফাঁকে কসরৎ করে বসানো চেয়ার। সেখানে আমরা বসি। বসার পর তাকে ভালো লেগে যায়। কিন্তু ইহজনমে তাকে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তবে কণ্ঠ কর্কশ বিধায় আগে হয়তো শুনে থাকবো।

সে বলে, ‘বড়ো সুখ লাগে বুঝলা রাইসু, তুমি প্রাপ্তিতে বড়ো সুখ হয়।’

আমি বলি, ‘তোমার কণ্ঠ বোধহয় আগে শুনে থাকবো।’

সে বলে, ‘শুয়ারের বাচ্চা!’ আমি হাসি। সে-ও হাসে। তার দাঁত সুন্দর। আমি বলি, তোমার দাঁত বোধহয় আগে কখনো দেখে থাকবো।

‘কিন্তু আগে কোনোদিনই দাঁতই ছিল না আমার!’—সে উঠে আমার ঠোঁট কামড়ে ধরে। আমার শিহরণ হয়। তার ছেলে আসে বারান্দায়। পাঁচ-ছয় বছরের শয়তান। কালো মোটা ফ্রেমের ইন্টেলেকচুয়াল চশমা। দাঁতের বিন্যাস মায়ের মতো নয়। পরস্পরবিচ্ছিন্ন। ফলে ভালো লাগে। তার মা, আমার পুরোনো দিনের বন্ধু, পরিচয় করিয়ে দেয় তার ছেলের সঙ্গে। বলে, ‘তোমার বাবা হন ইনি। হ্যান্ডশেক করো খোকা।’ খোকাবাবু হ্যান্ডশেক করে। বলে, ‘আগে কখনো দেখে থাকবো আপনাকে।’

‘আমিও।’

‘কী করছো এখন?’ তার মা জিগ্যেশ করে।

‘ছেলেটা কার আসলে?’ আমি জানতে চাই।

সে হাসে, ‘যাও বাবা ঘরে যাও।’ তার ছেলে ঘরে যায়। সে বলে, ‘তোমারই ছেলে। তা তুমি এখন কী করছো?’

আমি বলি, ‘গল্প-টল্প লিখি।’

‘আর কিছু না?’

‘না, আর কিছু না।’

‘চলো, আমার সঙ্গে ঘুরবে আজ।’ সে রিকশা নেয় এবং বলে, ‘গল্প কীভাবে লেখো, তোমার লজ্জা হয় না?’

আমি বলি, ‘গল্প লেখায় আবার লজ্জা কীসের?’

সে কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, ‘ঠিকই বলেছো, গল্প লেখায় আবার কীসের লজ্জা?’

: কিছু কিছু গল্প অবশ্য আছে, লিখতে সত্যি লজ্জা করে।

সে আগ্রহী হয় এবং আমি তাকে কিছু বলি না।

সে পুনরায় আগ্রহী হয় এবং আমি তাকে বলি। সে বলে, কী বললা বুঝলাম না। আমি তার কানের কাছে মুখ নিই এবং কিছু বলি না। সে খুব উল্লসিত হয়। বলে, ‘তাই নাকি! আমার খুব ভালো লাগছে। পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছে। ইশ্!’

আমিও ‘ইশ্’ বলি।

সে বলে, ‘কী, ভেঙচাচ্ছো নাকি?’

আমি বলি, ‘না ভেঙচাচ্ছি না। তোমার ছেলের বয়স কতো?’

‘সাত।’

‘সাত কেন?’

‘কীভাবে বলবো! আমি কীভাবে বলবো বলো! আমার কি বলার কিছু আছে।’ সে কাঁদতে লাগে। ফলে আমি হাসতে শুরু করি। আমি তাকে বলি, ‘তোমার মধ্যে উত্তেজনা হইছে লাইলি!’

সে বলে, ‘আমি লাইলি না, আমি যুলেখা।’

আমি বলি, ‘ঐ একই কথা। যাহা লাইলি তাহা—’

‘তাহা কী? বল্ কুত্তার বাচ্চা, তাহা কী?’

সে বক্র হয়। মোচড় দিয়ে তার যৌবন প্রকাশ করে। এবং তার অবস্থান থেকে খানিক উত্থিত হয়। ফলে তার ব্যক্তিত্ব। সে বলে, ‘চুতমারানি, এটাকে প্রেমের গল্প বানাবার ধান্দায় আছো, না?’

তার গালাগালকে আমার নারীবাদ ভ্রম হয়। আমি বলি, ‘না, এটা ঠিক প্রেমের গল্প না; এটা ক্রুয়ালটির গল্প। আমি শুধু ক্রুয়ালটির গল্পই লিখতে চাই।’

‘ক’টা লিখেছো?’

‘সাতটা।’

‘আমাকে দেখাবে?’

আমি তাকে হাসি : ‘কিন্তু আমাকে দেখা করতে চেয়েছেন কেন?’

‘সব বলছি। রহো।’

২.

আমরা একটা পিজা’র দোকানে ঢুকি। সেখানে লাল চেয়ারে বসি। সে মেনু দেখে। বলে, ‘ইক্সকিউস মি!’ তারপর অর্ডার দেয়। টিনটেড গ্লাস দিয়ে বাইরে তাকায়। বলে, ‘যে-শহরে এত রিকশা সেখানে হাই থিংকিং সম্ভব কী করে! বলো রাইসু, তুমি তো আমার ভাই হও, বলো কীভাবে সম্ভব?’

‘এটাই তোমার সমস্যা?’

‘না। এটা আমার সমস্যা হবে কেন? আর তোমাকে আমি কোনো সমস্যা শোনানোর জন্য ডাকি নি। আমি তোমার সংগে একটা দিন পরিব্যয় করতে চাই। অযথা আগ্রহ দেখাবে না। যা বলছি শুনে যাও।’ সে তার গল্প শুরু করে : ‘আমার তখন বয়স চোদ্দ। ফলে আমার এক মামার প্রেমে পড়ি। তিনি আমাকে ভূগোল পড়াতেন। বলতেন, মানুষের শরীর হচ্ছে মানচিত্র। বুঝতাম, এসব তিনি আমাকেই উদ্দেশ্য করেন। পর্বত, উপত্যকা, মালভূমি, আরো কী-সব কী-সব বলতেন। আমার তখন নতুন শরীর। এসব নোংরা শুনতে ভালোই লাগতো। তুমি বোধহয় জানো, সেই মামার সংগেই বিয়ে হয়েছিল আমার। বিয়ের পরও তাকে মামা ডাকতাম আমি।…’

‘তাই নাকি!’ আমি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করি। এতে সে বিরক্ত হয়। বলে, ‘ডিসটার্ব কোরো না রাইসু। যা বলছি শুনে যাও।’ সে পুনরায় তার গল্প শুরু করে: ‘কী বলছিলাম যেন? মামা ডাকতাম। মামা ডাকতাম, শেষে…যাই হোক, আমাদের ফ্যামেলি এ বিয়ে মেনে নেয় নি। তো, বিয়ের পর মামা আমাকে শাসন করা শুরু করলেন। আমাকে তুই করে বলা শুরু করলেন। বলতেন, “তুই তো কোনো ভালো মেয়ে না। মামার সংগে প্রেম করে বিয়ে করেছিস। তোর তো কোনো বিশ্বাস নাই।” তিনি তালা মেরে আটকে রাখতেন আমাকে ঘরের মধ্যে। গোপনে চাবি বানিয়ে নিয়েছিলাম দরজার। মামা কোনোদিন টের পান নাই। তখনই তো তোমার সংগে আমার পরিচয়। বরিশালে। মনে নেই তোমার?’

আমি ‘না’ বলি।

সে আমার ‘না’-কে পাত্তা দেয় না। দুই হাতে ঝাপটা মেরে উড়িয়ে দেয়। দিয়ে ফিক্ করে হেসে ফেলে: গল্পটা কেমন বানালাম?’

আমি সায় দিই। সে আমাকে জিগ্যেস করে, ‘তোমার কী মনে হয়, কেন একটি গল্প গল্প হয়ে ওঠে?’

আমি বলি, ‘বিশ্বাসযোগ্যতা—বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হয় গল্পের।’

‘কিন্ত বেশিরভাগ গল্প, ভালো ভালো গল্পগুলি কি অবিশ্বাস্য নয়?’

‘তাহা ম্যাডাম, তাহা।’

‘কিন্তু সেসব গল্প খুবই বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাই না রাইসু সাহেব?’

আমি তার চোখের মধ্যে তাকাই: ‘তুমি একটু পাগলা আছো লাইলি।’

‘তো?’

‘তো আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ আমি তার শিরদাড়া বরাবর আঙুল ঢুকিয়ে দেই। সে মিষ্টি করে হাসে। বলে, ‘আমারো জগতে শুধু গান।’ আমি জিগ্যেস করি, ‘কার গান গো?’

সে হাসে। বলে, ‘তোমারই।’

৩.

তার হাজব্যান্ড আসেন বারান্দায়। ভদ্রলোক ফর্শা। মাগীমার্কা চেহারা। সোডিয়ামের আলোয় তাঁর মাগীভাব প্রকট হয়। বারান্দায় এসে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন যে তিনি আছেন কি নেই।

আমি বলি, ‘আপনি তো নেই।’

এতে আশ্বস্ত হন তিনি। গিয়ে এক কোনায় ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে থাকেন। লাইলি কাচভাঙার মতো হেসে ওঠে। আমার দিকে তাকায়, ‘আমি জানতাম, আমি জানতাম তুমি বলবা।’

‘কী বলবো?’

‘এই যে বললা, তুমি আমারে ভালোবাসো।’

‘কখন বললাম?’

‘বলেছো, একটু আগে বলেছো।’

‘কিন্তু তোমাকে তো আমি জানি নাই প্রায়।’

‘কে কাকে জানে বলো?’

‘তা ঠিক,’ আমি তার হাজব্যান্ডের দিকে তাকাই। ভদ্রলোক উপদ্রবহীন তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে। আমি তাঁকে মৃদু হাসি। লাইলি গাল দেয়: ‘খানকির বাচ্চা!’ কাকে দেয় কে জানে। আমার ভালো লাগে। আমি ঠিক করি কোনো গল্পই আত্মহত্যা দিয়ে শেষ করবো না। খুনখারাবি দিয়ে শেষ হয় শুধু দুর্বল গল্পগুলি। লাইলি আমার সন্দেহে একমত হয়। আমরা ঠিক করি দু’জন মিলে কিছু গল্প লিখবো।

সে বলে, ‘আমার খুব অভিজ্ঞতা।’

আমি বলি, ‘অভিজ্ঞতা ছাড়া তো গল্প হয় না।’

সে বলে, ‘সমাজ ছাড়াও গল্প হয় না।’

আমরা সমাজ ও অভিজ্ঞতার কথা লিখবো…

আমরা আস্তে আস্তে ভাষাকে কলুষিত করে ফেলবো…

লাইলির হাজব্যান্ড এরমধ্যে একবার এলেন, ‘আমার বৌকে আপনার কেমন লাগলো?’

আমি একটু হকচক খাই। আসলে খাই না। ভাব করি খেয়েছি। তারপর লাইলির দিকে তাকাই। লাইলি হাসি-হাসি মুখ ক’রে ভাষাকে কলুষিত করে দেয়: ‘রামছাগলটা জানতে চাচ্ছে আমার টেস্ট কী রকম; বোঝো না তুমি?’

‘বুঝি তো। বুঝি। একটু নোনতা আছো তুমি।’

‘আমি নোনতা! কী কইতে চাও মিয়া?’

‘কইতে চাই, তোমার মধ্যে প্রভূত লবণের ব্যবসায় আছে।’

‘তাই নাকি! আপনার জিহ্বা অনেক বৃহৎ হইছে মনে হয়।’

‘জ্বী হয় খালাম্মা, ইহা অনেক বৃহৎ হইছে।’

লাইলির হাজব্যান্ড মাঝখানে ঢুকলেন, ‘বৃহৎ এবং ক্ষুদ্র, এটা আসলে আপেক্ষিক ব্যাপার। যাহা ক্ষুদ্র তাহাই বৃহৎ আবার যাহা বৃহৎ তাহাই ক্ষুদ্র।’

‘আপনারে কে বললো?’ আমি জিগ্যেশ করি।

‘বললো। আছে। বইয়ে লেখা আছে।’

‘ওর সঙ্গে তুমি বাক্যালাপ করছো কেন? তুমি আমার সঙ্গে বাক্যালাপ করো।’ বলে লাইলি।

আমি লাইলি সঙ্গে বাক্যালাপ শুরু করি: ‘লাইলি, আবেগ কমিয়া যাইছে।’

লাইলি মলিন হয়, ‘এটা তো খুবই ইয়ে। তুমি ডাক্তার দেখাও না কেন?’

‘সেই জন্যেই তো আপনার কাছে আসা,’ আমি লাইলিকে তাকাই।

‘তাই নাকি! আইস, আইস, অভ্যন্তর হও।’

৪.

আমরা লাইলির শোওয়ার ঘরে ঢুকি। লাইলি গিয়ে তার বিছানায় শোয়। আমি তার পাশে বসি। সে বলে, ‘যুলেখা বাদশার মেয়ে।’ তারপর দুই হাতে জাপটে ধরে আমাকে, ‘আমার কিছু ভালো লাগে না রাইসু, আমার কিছু ভালো লাগে না।’ লাইলি তার ঠোঁট বাঁকা করে। ঢোক গেলে। চোখ পাল্টায়। তার সারা মুখ তিরতির করে। অদ্ভুত দক্ষতায় সমস্ত শরীরে ক্ষীণ ও তাৎক্ষণিক একটা ঝাঁকুনি দেয়। তারপর বলে, ‘কোনো-কোনো দিন এমন হয় না রাইসু, কী বলবো, আমার একদম মরে যেতে ইচ্ছে করে।’

‘কখন করে এটা?’

‘এই সকালের দিকে। তখন আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে। মনে হয় এই জগৎসংসার সব অর্থহীন। কেউ আমারে বুঝতে পারলো না।’

‘তারপর?’

‘তারপর আমার খালি খালি লাগে। মনে হয় শূন্য হয়ে গেছি।’

‘তারপর?’

‘তারপর আমার বন্ধুরা সব ঝাঁক বেঁধে আসতে থাকে। তুমি তো জানোই, আমার সব পুরোনো বন্ধুদের দিয়ে তৈরি আমার এই পার্সোনালিটি—এই আমি।’ লাইলি তার বুকের দিকে তাকায়। আমিও।

‘তুমি একবার ভাবো, আমার এই জীবৎকালে পুরোনো বন্ধুদের সংখ্যা কতো-কতো!’ লাইলি তার পুরোনো বন্ধুদের নাম মুখস্ত বলে যায়। দেখি আমার নামও বলছে। কিয়ৎ আশ্চর্য হই। আশ্চর্য হওয়া থামলে ফের শুরু করে সে: ‘তো, আমার এই যে পার্সোনালিটি—এটা একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ব্যাপার, নয় কি?’

আমি লাইলির বুকের দিকে পুনরায় তাকাই: অলওয়েজ নট, ম্যাডাম। অলওয়েজ নট।

‘সেক্ষেত্রে চিন্তা করে দ্যাখো, পাখি উড়ে গেছে কিন্তু পড়ে আছে তার ছায়া—সেই ছায়া দিয়ে আমি করবোটা কী?’

‘তুমি এইখানে পাখি পাইলা কই?’

‘এটা একটা অ্যানালজি—উদাহরণ। সবকিছু বুঝতে চাও কেন? তোমাকে না বলেছি, কেবল শুনে যাও।’

‘ঠিক আছে শুনছি। তারপর?’

‘তারপর, তারপর আমি যাদের কারণে আমি, সেই তারা তো প্রায় কেউ নেই। মানে তারা তো আর তারা নেই। তারা তো এখন না-তারা। এখন আমি কী করবো?’

‘থাকলে কী করতা?’

‘থাকলে কী করতাম সেটা তো কোনো ইয়ে না। তারা যে নেই, নেই যে, এই যে নাথিংনেস, এইটাই বড়ো। আমি এই ‘না’-টা নিয়ে প্রতিদিন সকালে দুঃখ দুঃখ করতে চাই। নস্টালজিয়া করতে চাই। কাঁদতে চাই আমি। আমি কাঁদতে চাই। আই ওয়ান্ট টু ক্রাই…’… লাইলি চিৎকার করতে করতে বিছানা ছেড়ে লাফ মেরে উঠে দাঁড়ায়। তার বৃহৎ স্বামী এবং ক্ষুদ্র সন্তান এসে দাঁড়ায় দরজার সামনে। লাইলি এবার দ্বিগুণ শব্দ করে: ভাগ্ কুত্তার বাচ্চারা! ভাগ্ এখান থেকে!!

দুই ভদ্রলোক ছিটকে পড়লে আমি গিয়ে জড়িয়ে ধরি লাইলিকে, ‘লাইলি, তোমার স্ট্রাকচারে খুব ডেডিকেশান!’

লাইলি ঝটকা মেরে সরিয়ে দেয় আমাকে, ‘ইতর কোথাকার! সুযোগ নিতে চাও? লজ্জা করে না…?’

‘স্থির হও লাইলি। স্থির হও। তোমার কী হইছে?’

‘ওর কিছু হয় নাই। আপনি আমাদের বিরক্ত করবেন না প্লিজ।’ তার স্বামী—বৃহৎ ইন্টেলেকচুয়ালটি—এইরূপ বলে। তখন লাইলির পুত্র—ক্ষুদে ইন্টেলেকচুয়াল—মাথা ঝটকায়: আমার মা তো দেখেন কতো কান্নাকাটি করে! এখন আমরা কী করবো?

আমি লাইলির ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসি। লাইলি বলে, ‘দাঁড়াও।’

আমি দাঁড়াই। লাইলি এসে হাত ধরে আমার।

৫.

আমরা ঠিক করি—আমি আর লাইলি—আমাদের বাচ্চাকাচ্চা হলে তার নাম রাখবো হ্রাহা। লাইলি হা হা দিয়ে ওঠে: ছেলে হলে হ্রাহা, মেয়ে হলে হ্রিহি।

আমি বলি, ‘ঠিক আছে। কিন্তু বাচ্চা কিভাবে নেবো আমরা? আমরা তো বিয়ে করি নাই!’

: বাচ্চা তো হবে আমার। তোমার এতসব চিন্তার কী দরকার?

‘তা ঠিক। কিন্তু মেয়েদের তো আমি দেখি মায়ের মতো।’

: তোমাকে আর দেখার সুযোগ দেওয়া হবে না। চোখে পট্টি বেঁধে দেয়া হবে তোমার। তারপর বাচ্চা নেবো আমরা।

‘আমার এসব ভয় করে লাইলি!’

: তোমার ভয়ের কিছু নাই। যার চোখ নাই তার ভয়ও নাই।’

‘তোমার হাজব্যান্ড যদি রাগ করে?’

: ও রাগ করবে কেন? ওর চোখেও পট্টি বেঁধে দেব আমরা। যার চোখ নাই তার রাগও নাই। আর গল্পের মধ্যে সবই সম্ভব।

‘তা ঠিক, আমাদের গল্পে কতো জায়গা বড়। কত সুযোগ সেখানে!’

: অনেক সুযোগ!

‘আমরা শুধু গল্পের মধ্যেই বাস করতে চাই।’

: গল্পের মধ্যেই করতে চাই আমরা।

৬.

এবং আমরা করি।

নিয়মটা হচ্ছে: প্রথমে দুজনের চোখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলতে হয়। তারপর আমরা কাঁদতে থাকি। লাইলির হাজব্যান্ড এসে বলেন, ‘কী হয়েছে?’ তখন আমরা বলি যে আমরা বাচ্চা নিতে চাই।

ভদ্রলোক বলেন, প্রত্যেকেরই বাচ্চা নেওয়া উচিত। তারপর তাঁকে সাক্ষী রেখে বাচ্চা নিই আমরা। পরদিন বাচ্চা হয়। মেয়ে। বাচ্চার নাম হ্রাহা।

রচনা: ১৯৯৩

 

গুহ্য

এই কথা মূল্যবান আবারও জানাই
মাথা তিনখানি কিন্তু এক বিন্দু মাথাব্যথা নাই
তাই বড়ই চিন্তায় আছি। আর

কথামাত্র আছে একটাই মূল্যবান—
যতক্ষণ প্রাণ আছে লম্বা করো কান
শোনো জাতীয় সঙ্গীত। আর বাদবাকি

দুনিয়াতে ফ্যাকরা আছে মোটে সর্ব সাইত্রিশ প্রকার
তার একখানি এই,
জগতের ভালোমন্দ কোনো অর্থ নেই

আছে বোতল গেলাশ। তাই
মূল্যবান কথা আমি অপাত্রে দেব না
বরং বোতলবন্দি করে রাখবো গুণে গুণে ছত্রিশ বছর

আর তারপর? এসবের পরে যদি
কৌতূহল বাকি থাকে কারো—নিয়ে যাও গুহ্যবাক্য
ভদ্রজনগুহ্যে-গুহ্যে সম্প্রচার করো

(মাহবুব কবির সম্পাদিত সুমেশ্বরী পত্রিকায় ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত)

 

মৃত্যুচিন্তা করেন এমন কাউকে নিয়ে গল্প লেখা কঠিন

আমরা যে-দিনগুলিতে কেবলই বৈচিত্রের সন্ধান, আর বলছি ভালো লাগে না ভালো লাগে না, তেমন দিনে যিনি আমাদের বুঝতে পারতেন তিনি থাকতেন সদাই গম্ভীর, ফলে প্রতিটা বিষয়েই তার ছিল নিজস্ব সব ভিন্নমত। আর যখনি আমরা তার কাছে গিয়েছি তো আমাদের চা দিয়েছেন বিস্কিট দিয়েছেন, বলেছেন, ‘শোনো, নতুন একটা চিন্তা এসেছে মাথায় কিন্তু তার আগে তোমরা ভাতটাত কী খাবে বলো, আমি লাইলিকে বলি।’ কিন্তু আমরা নিশ্চই করে জানতাম, তাঁর যে নতুন চিন্তা, তা মৃত্যুবিষয়ক। আমরা কখনোই বুঝতে পারি নি কারো একজনের মৃত্যু বিষয়ে কেন এত চিন্তা করতে হয়, এবং আমরা বলেছিলাম যে দুপুরে আমরা খাবো।

লাইলি, যেহেতু তাঁর মেয়ে এবং একমাত্র, সে বলে, ‘তোমরা ভাত খেতে এসছো বুঝি।’ আমরা ‘হাঁ’ বলতেই তিনি গম্ভীর মুখে বলতেন, ‘বুঝলে, আত্মহত্যা-করতে-চায় এমন কাউকে দেখলে আমার কাছে নিয়ে আসবে। এরা মৃত্যুকামনা থেকে একধরনের যৌনানন্দ পায়, আমি একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম, করি নি কেন জানো?’ লাইলি, যেহেতু তাঁর মেয়ে, সে জিজ্ঞেস করে, ‘আনন্দের জন্য বুঝি?’

আমরা হাসি। হাসতে হাসতে কেউ দাঁড়াই। কেউ, ‘চায়ে চিনি কম দিয়েছো লাইলি, ঘটনা কী?’ কেউ, ‘কিন্তু ফ্রয়েডের সব কথাই মেনে নেয়ার কোনো কারণ আছে কি?’

তিনি কখনো হাসেন না। মৃত্যুচিন্তা যিনি করেন, তার মুখে হাসি শোভা পায় না। ফলে তাঁর মেয়ে একাই হাসে। আমরা ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসি।

২.
আমরা তাঁর ঘর ছেড়ে সোজা হেঁটে যাই। সামনে যে-বাসা, নক করি। দরজা খোলে। ভেতরে ঢুকি। আমরা হাসি। ঘরভর্তি লোকজন। আমাদের বসতে বলে। বলে, ‘আপনারা বসুন। আমরা আত্মহত্যা করতে চাই।’ আমরা পরিবারটিকে লাইলির বাবার কাছে নিয়ে আসি। লাইলির বাবা বলেন, ‘আত্মহত্যা হচ্ছে নিজেকে ধবংস করার প্রবণতা। মর্ষকাম। এর সঙ্গে যৌনতা জড়িত।’

যৌনতার কথা ওঠায় আমাদের সবারই উত্তেজনা হয়। আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল যে-পরিবারটি তার সব সদস্যরা নগ্ন হয়। লাইলি নগ্ন হয়। লাইলির বাবা নগ্ন হন। লাইলি হাসে। একাই, এবং বলে, ‘এ ধরনের গল্প আসলে পর্নোগ্রাফি।’

আমরা স্বীকার করি। লাইলির বাবা, যেহেতু প্রধান চরিত্র, বলেন, ‘পর্নোগ্রাফির ইতিহাস তোমরা জানো নাকি কিছু?’

লাইলি হাসতে হাসতে বলে, ‘আসলে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।’ যেন এই প্রথম কেউ স্বপ্ন দেখলো, এবং আমরা যৌনানন্দ থেকে ফ্রয়েড-মারফৎ স্বপ্নের মধ্যে চলে আসি।

‘কী স্বপ্ন তুমি দেখলা লাইলি?’

লাইলি বলতে রাজি হয় না। পরে বলে, সে দেখেছে হুমায়ূন আহমেদকে। তিনি পশুপাখির সঙ্গে কথা বলছেন।

আমরা হুমায়ূন আহমেদকে ফোন করি। কে এক পিচ্চি ফোন ধরে, ‘কী চাই?’

আমরা বলি, ‘হুমায়ূন আহমেদ সাহেবকে আমরা চাই। তিনি কি আছেন?’

এবার অপেক্ষাকৃত খসখসে ও বয়স্ক কণ্ঠ, ‘হুমায়ূন তো নেই। ও বাচ্চাদের নিয়ে জিরাফ দেখতে গেছে।’

আমরা লাইলির বাবাকে জিজ্ঞেস করি, জিরাফ দেখার ক্ষেত্রে কোনো আইনগত নিষেধ আছে কি না, বাচ্চাদের। তিনি বলেন, এগুলো আসলে তেমন জরুরি কিছু নয়।

‘কিন্তু আপনি আত্মহত্যা করতে গেলেন কেন?’

‘সে সব আমি বলতে চাই না।’ আর তিনি বলা শুরু করেন, ‘লাইলির যখন মা চলে যায় তখন তার বয়স আট।’

‘আট কেন? ‘ভদ্রলোকটি কে ছিলেন? ‘আপনি আগে টের পাননি? ‘অবশ্য এগুলো আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার (যেন ব্যক্তিগতর বাইরে কোনো ব্যাপার রয়ে গেছে।)।’’’’

ফলে মৃত্যুচিন্তা করেন এমন কাউকে নিয়ে গল্প লেখা কঠিন। আমরা ঘুরে-ফিরে লাইলির কাছেই ফিরে আসি। আর এইমাত্র, গতকাল, লাইলি ফোন করে জানিয়েছে যে তার বাবা মারা গেছেন, আমরা যেন তাকে দেখতে যাই।

১৯৯৩